উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রেকর্ড উৎপাদনই এখন গলার কাঁটা আলু চাষিদের

সুজন আলী ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৫৯ অপরাহ্ণ
রেকর্ড উৎপাদনই এখন গলার কাঁটা আলু চাষিদের

বাংলাদেশে কোনো ফসলের রেকর্ড ফলন সাধারণত কৃষি খাতের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আলু চাষের ক্ষেত্রে চলতি মৌসুমে সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। দেশে এবার আলুর রেকর্ড উৎপাদন হলেও চরম সংকটে পড়েছেন আলুচাষীরা। উৎপাদনের সাফল্যই যেন এখন তাদের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

জানা যায়, চলতি মৌসুমে দেশে আলুর উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন। অথচ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র ৯০ লাখ টন। এই উদ্বৃত্ত প্রায় ২০–২৫ লাখ টন আলু পুরো বাজার ব্যবস্থাকে ঠেলে দিয়েছে গভীর সংকটে। কেননা, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারে আলুর সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে হিমাগারগুলোতে গত মৌসুমের অবিক্রিত আলুর বিপুল মজুদ রয়ে গেছে। এর মধ্যেই নতুন আগাম আলু বাজারে আসতে শুরু করায় সরবরাহ আরও বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে, আলুর দামে নেমেছে ভয়াবহ ধস। এতে কৃষকের ঘাড়ে জমেছে দেনার বোঝা।

এদিকে, একসময় যে হিমাগার ছিল কৃষকের ভরসা, আজ সেটাই হয়ে উঠেছে লোকসানের প্রতীক। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সময়সীমা শেষ হয়েছে ৩০ নভেম্বর। অথচ সময় শেষ হলেও হিমাগারগুলোতে রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ আলু।

বাজারদর কোল্ড স্টোরেজ ভাড়ার চেয়েও কম হওয়ায় কৃষকরা আলু তুলতে আসছেন না জানিয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, রাজশাহীর ৪৬টি হিমাগারে এখনও প্রায় ৬ লাখ বস্তা আলু মজুদ রয়েছে। বর্তমানে হিমাগারে শুকনা আলু ৫–৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, অথচ হিমাগারের ভাড়াই কেজি প্রতি ৬.৭৫ টাকা।

তানোর উপজেলার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, এক বস্তা আলু রাখতে খরচ ৪৫০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করলে পাওয়া যায় ২০০ টাকা। এই লোকসান কেউ আর নিতে পারছে না। তাই লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক হিমাগার থেকেই আলু তুলছেন না।

এই অবস্থায় কৃষকরা আলু তুলতে না আসায় বিপাকে পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও। তাদের দাবি, শুধু ভাড়া বাবদ লোকসান প্রায় ২৫ কোটি টাকা, ঋণ ও সুদ মিলিয়ে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত নভেম্বর–ডিসেম্বরে আগাম আলু কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু এবার সেই চিরচেনা চিত্রও বদলে গেছে। বর্তমানে নতুন আগাম আলু কৃষক পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১০–১২ টাকা কেজি, যেখানে উৎপাদন খরচই পড়েছে ২০–২৫ টাকা।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষকদের তথ্যমতে, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার আগাম আলুর উৎপাদন খরচ গতবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল মালেক জানান, তিনি প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে প্রায় ২২ টাকা খরচ করলেও তা মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, হিমাগারে পুরনো আলুর আধিক্যের কারণেই বাজারে নতুন আলুর দরপতন হয়েছে।

রংপুর ও নীলফামারী জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে প্রতি কেজি আলু ৭–১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অনেক চাষি আলুকে গরুর খাবার বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চাষিদের অভিযোগ, আলু ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। গত আগস্টে সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর সর্বনিম্ন মূল্য প্রতি কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ দেখা যায়নি। একইভাবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের ৫০ হাজার টন আলু সংগ্রহের পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।

রপ্তানির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় প্রতিবন্ধকতা। মানসম্মত কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কৃষকদের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাজশাহীর বায়াতে অবস্থিত সরকার কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক রুহুল আমিন জানান, তাদের হিমাগারে এখনো ১৩ হাজার ৫০০ বস্তা পুরোনো আলু পড়ে আছে। কয়েকদিন আগে ১১ টাকা কেজি দরে কিছু আলু বিক্রি হয়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে কোনো ক্রেতা আসেনি। তানোরের রহমান কোল্ড স্টোরেজের কর্মী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আলু ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আমরা মাইকিং করছি প্রতিদিন। কিন্তু চাষি বা ব্যবসায়ীরা কেউ আসছেন না।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘চাষিদের অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, তারা অনেক যত্ন করে ফসল ফলিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ফসলের বাজারমূল্য এখন হিমাগারের ভাড়ার চেয়েও কম। অনেকটা “খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি” হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে কৃষকরা আলু চাষ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে বাজারে আলুর তীব্র সংকট ও দামের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করবে।

রাজশাহী কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, গত মৌসুমে রাজশাহীতে আলু চাষ হয়েছিল ৪০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ১০ লাখ ১৩ হাজার টন। তবে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন।

Read more — কৃষি
Home