উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অসময়ে বৃষ্টিতে চার জেলায় ১৩১ কোটি টাকার ফসলহানি, ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩ হাজার কৃষক

সুজন আলী ১২ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৪৭ অপরাহ্ণ
অসময়ে বৃষ্টিতে চার জেলায় ১৩১ কোটি টাকার ফসলহানি, ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩ হাজার কৃষক

নভেম্বরের শুরুতেই অসময়ের বৃষ্টিতে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় (রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছে। মাত্র দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে ১৯ হাজার ৫০০ হেক্টরেরও বেশি আবাদি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪২ হাজার ৮৯৯ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, এ বৃষ্টিতে মোট ১৩১ কোটি ৩১ লাখ টাকার ফসলহানি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আমন ধান, শীতকালীন সবজি, রসুন, সরিষা, পেঁয়াজ ও আলু।

গত ১ ও ২ নভেম্বরের ভারি বর্ষণে রাজশাহী বিভাগের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়। ঠিক ধান কাটার মৌসুমে হঠাৎ এ বৃষ্টিতে ক্ষেতের ধান নুয়ে পড়ে যায় এবং সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১ হাজার ৬৪৯ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট, আর ১৩ হাজার ৮৬০ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধানে— ৫৮৫ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট, আর ১২ হাজার ৫০১ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া সবজি নষ্ট হয়েছে ১০৮ হেক্টরে (আংশিক ক্ষতি ৪৩৪ হেক্টরে), রসুন ৩০১ হেক্টর, সরিষা ৪৫৩ হেক্টর, পেঁয়াজ ৬০ হেক্টর ও আলু ৪২ হেক্টর জমিতে ক্ষতি হয়েছে।

রাজশাহী ও নওগাঁ জেলায় ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই দুই জেলার অধিকাংশ জমির আমন ধান ছিল কাটার উপযোগী অবস্থায়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সবিনা বেগম বলেন, “বৃষ্টি এসেছে ফসল কাটার ঠিক আগমুহূর্তে। এতে অনেক কৃষকই চরম বিপাকে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, যারা মৌসুমি ফসলের ওপর নির্ভরশীল।

রাজশাহীর তানোর, দুর্গাপুর ও বাঘা এবং নওগাঁর মান্দা ও রাণীনগর উপজেলার কৃষকেরা জানান, তাদের ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে; পাকা ধান পড়ে গেছে মাটিতে, কাটাও সম্ভব হচ্ছে না।

সম্প্রতি তানোর, পবা ও মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ধানক্ষেত এখনো পানিতে ঢুবে আছে। কাটা ধান ক্ষেতের ধারে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কৃষকেরা কেউ পাম্পের মাধ্যমে, কেউ ছোট নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন।

তানোর উপজেলার বিদ্যোপুর গ্রামের কৃষক আবদুল হান্নান (৫৬) বলেন, “আঠারো কাঠা জমির ধান ক’দিনের মধ্যেই কাটার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে সব পানির নিচে। আর অপেক্ষা করলে ধান পচে যাবে। নভেম্বর মাসে এমন বৃষ্টি জীবনে দেখিনি।”

অন্য কৃষক আবদুল মালেক বলেন, ধান অর্ধপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। ফলে ফলন অনেক কম হবে। এতে অনেক লোকশানের মধ্যে পড়তে হয়েছে। যা পুষিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে, অকালবৃষ্টিতে শীতকালীন সবজির চাষ ও আলু রোপণ বিলম্বিত হচ্ছে। নিচু জমিতে এখনো হাঁটুপানি থাকায় অনেক কৃষক বীজ বপন করতে পারছেন না।

কৃষক আবদুল হান্নান বলেন, “আমরা সাধারণত আমন কাটার পর আলু লাগাই। কিন্তু এ বছর জমিতে হাঁটুপানি। তাই অনেক জমিই ফাঁকা থাকবে।”

কৃষি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি আবার বৃষ্টি হলে বোরো বীজতলা প্রস্তুতি ও শীতকালীন ফসল চাষ আরও বিলম্বিত হবে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক রব্বানী মণ্ডল বলেন, আমার পাঁচ বিঘা জমি এখনো পানির নিচে। চারপাশে পুকুর থাকায় পানি নামছে না। সরকারের সাহায্যই এখন ভরসা। সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, বৃষ্টিজনিত ফসল ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রণোদনা বা সহায়তা দেওয়া হবে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

Read more — কৃষি
Home