উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাজশাহীতে হলুদ ও তুলা চাষে অর্ধেক খরচ, দ্বিগুণ লাভ

উত্তরা প্রতিবেদক ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৫০ অপরাহ্ণ
রাজশাহীতে হলুদ ও তুলা চাষে অর্ধেক খরচ, দ্বিগুণ লাভ
রাজশাহীতে চারঘাটে হলুদের সঙ্গে তুলা চাষ পরিদর্শনে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল আমিনসহ কৃষি কর্মকর্তা

রাজশাহীতে একসঙ্গে হলুদ ও তুলা চাষ কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। ‘ন্যাচারাল অ্যান্টিবায়োটিক’ হিসেবে পরিচিত হলুদ আর ‘হোয়াইট গোল্ড’খ্যাত তুলা এখন একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে চাষ হচ্ছে। ফলন দ্বিগুণ, খরচ কমছে অর্ধেকের মতো। কৃষিবিদরা বলছেন, একসঙ্গে দুটি ফসল চাষ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারঘাট উপজেলার পাটিয়াকান্দি গ্রামের কৃষক মো. জানামুল মণ্ডল চলতি মৌসুমে সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করেছেন। এর মধ্যে সাড়ে ৩ বিঘায় সাথি ফসল হিসেবে তুলা করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, শুধু তুলা থেকে আয় হবে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর হলুদ থেকে বিঘাপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ মণ উৎপাদন হবে, যার বাজারদর ৮-১২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে হলুদের আয় দাঁড়াবে এক লাখ টাকার বেশি।

জানামুল বলেন, ‘হলুদের সঙ্গে তুলার চাষ করলে আলাদা সার-কীটনাশকের দরকার হয় না। হলুদ লাগানোর দেড় মাস পর তুলা রোপণ করা হয়। খরচ কম, ফলন বেশি— এটাই সাফল্যের রহস্য।’

শুধু জানামুল নন, তার দেখাদেখি চলতি মৌসুমে চারঘাটে ৭৫০ জন কৃষক মোট ২৩০ হেক্টর জমিতে তুলার চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৩৬ জন কৃষক ১২ হেক্টর জমিতে হলুদের সঙ্গে তুলা উৎপাদন করছেন। জেলার অন্যান্য উপজেলায় তুলা চাষ এখনো সীমিত হলেও, চারঘাটে এ বছরই ৫০ হেক্টর জমিতে তুলার চাষ বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চারঘাট ছাড়াও গোদাগাড়ীতে ৩ হেক্টর, বাঘায় ২৭ হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হয়েছে। গত বছর চারঘাটে ৩৪৫ মেট্রিক টন, গোদাগাড়ীতে ১৯ মেট্রিক টন এবং বাঘায় ৮৩ মেট্রিক টনসহ জেলায় মোট ৪৩৮ মেট্রিক টন তুলার উৎপাদন হয়েছিল।

কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হলুদ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও চারঘাট ও বাঘা দেশের অন্যতম শীর্ষ এলাকা। এ বছর শুধু চারঘাটেই ৭০০ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হলুদ নিজেই এক ধরনের প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক, যা মাটিতে রোগজীবাণু দমন করে। ফলে একই জমিতে তুলা চাষ করলে তুলার পোকামাকড় ও ছত্রাক আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কমে যায়।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হলুদ ও তুলার মূলতন্ত্র ভিন্ন। তুলা গভীর স্তর থেকে পানি-পুষ্টি টানে, আর হলুদ উপরের স্তর থেকে। প্রতিযোগিতা হয় না। বরং একে অপরকে সহায়তা করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত হলুদের জমিতে পোকামাকড় কম থাকে। ফলে তুলাকেও কম স্প্রে করতে হয়। একই জমিতে দুটি ফসল চাষ করলে খরচ কমে যায় এবং উৎপাদন বেড়ে যায়। হলুদের ফলনও সাধারণ জমির তুলনায় বাড়ছে।’

জানা যায়, চারঘাটের পাটিয়াকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে সম্প্রতি তুলা উন্নয়ন বোর্ড কৃষক সমাবেশ আয়োজন করেছে। সেখানে কৃষকদের হলুদসহ অন্যান্য ফসলের সাথি ফসল হিসেবে তুলা চাষের উপায় জানানো হয়।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, ‘জমি কমছে, কিন্তু মানুষের চাহিদা বাড়ছে। সাথি ফসল ছাড়া বিকল্প নেই। পৃথকভাবে তুলা বা হলুদ চাষে এত উৎপাদন পাওয়া যায় না। ভবিষ্যতে আমরা দেশের সব হলুদের জমিতে তুলা সাথি ফসল হিসেবে চাষ করাতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৃথক চাষের তুলনায় যে জমিতে হলুদের সঙ্গে তুলা চাষ করা হয়েছে, উভয় ফসলেরই ফলন অনেক ভালো হয়েছে। আমরা চাই— হলুদসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে তুলার চাষ হোক। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, উৎপাদন বাড়বে, চাষিরা বেশি লাভবান হবেন এবং দেশও উপকৃত হবে।’

Read more — কৃষি
Home