
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্টিয়াগো পেনিও বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেছেন। তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক অধিগ্রহণ করার পর দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিজেদের টাকা তোলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার হাজার হাজার প্যারাগুয়েবাসী পার্লামেন্টের সামনে জড়ো হয়ে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পেনিও পদত্যাগপত্র জমা দিলেও সেটি পার্লামেন্টে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় কারিগরিভাবে তিনি এখনো ক্ষমতায় রয়েছেন।
দুই দিন আগে সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ প্যারাগুয়ে উয়েনো ব্যাংক অধিগ্রহণ করার পর পেনশনভোগীসহ প্রায় ৩০ লাখ মানুষের ডিপোজিট ফ্রিজ হয়ে যায়, যা সারা দেশে তীব্র বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
বার্তা সংস্থা এএফপি-র সাংবাদিকরা জানান, আন্দোলনকারীরা এ সময় আমাদের টাকা ফেরত দাও বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এর আগের বিক্ষোভগুলোতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, যেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সামলানোর চেষ্টা করেছিল।
এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ২১ বছর বয়সি শিক্ষার্থী আন্দোলনকারী আন্দ্রেস মালদোনাদো বলেন, আমার পরিবারের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে, আমাদের কাছে কোনো নগদ অর্থ নেই। সান্টি (পেনিও) একজন অপরাধী, তাকে জেলে যেতে হবে।
এই সংকটের প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আইনপ্রণেতারা সর্বসম্মতিক্রমে বৃহস্পতিবার পেনিওর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট দেন। পেনিওর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকের কারবারে অপব্যবহার ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দেশবাসীকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করার পর জানান যে তিনি শুক্রবারের অভিশংসন ট্রায়ালে অংশ নেবেন। এক্স-এ পোস্ট করা ভিডিওতে তিনি বলেন, আপনাদের দেওয়া বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কোনো উদ্দেশ্য আমার কখনোই ছিল না।
তিনি আরও যোগ করেন, তার মূল অগ্রাধিকার হলো প্যারাগুয়েবাসীদের মনের শান্তি ফিরিয়ে আনা, যারা আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রেখে নিজেদের সঞ্চয় আমানত হিসেবে রেখেছিলেন।
প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের রক্ষা করা এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য মূলধনের চরম ঘাটতির কারণে উয়েনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে।
২৬ বছর বয়সি তিন সন্তানের জননী নাদিয়া গঞ্জালেস এএফপি-কে বলেন, প্রথম বাড়ি কেনার জন্য উয়েনো ব্যাংক আমাদের একটি ঋণ অনুমোদন করেছিল। কিন্তু ফান্ড কখনোই ছাড় করা হয়নি, আর এখন আমাদের কোথাও থাকার মতো জায়গা নেই।
মঙ্গলবার ও বুধবার আসুনসিওনের রাস্তায় উয়েনো ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার সামনে নিজের টাকা তোলার জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী একটি গ্রুপের শেয়ারের মালিক ছিলেন পেনিও, তবে তিনি গত বছর তা বিক্রি করে দেন।
পেনিও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কার্লোস কারভালোর পদত্যাগ দাবি করেন এবং পাঁচ দিনের মধ্যে মানুষের আমানত ফেরত দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু এর কোনোটিই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ছিল না।
কংগ্রেস বৃহস্পতিবার উভয় কক্ষের এক জরুরি অধিবেশন আহ্বান করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে তারা কি পেনিওর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবে নাকি তা প্রত্যাখ্যান করে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু কোরাম সংকটের কারণে সেখানে ভোটদান সম্পন্ন হতে পারেনি। পরবর্তীতে নির্ধারিত আরেকটি জরুরি অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয় শুক্রবার সকালে অভিশংসন বিচার শুরু হবে।
বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা রাউল বেনিতেজ বলেন, এখানে একটি অপরাধমূলক স্কিম তৈরি করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি ব্যাংককে ফাঁকা করা আর তা করা হয়েছিল এমন প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে, যা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
সরকারি দলের সিনেটর দেরলিস মাইদানা সাংবাদিকদের জানান, জনগণের মধ্যে আস্থা ও শান্তি ফেরাতে শুক্রবারই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেনিওর পর এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানার। সূত্র: এনডিটিভি।

