
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল, নারীর রাজনৈতিক অধিকার এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার নিজের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে দেওয়া এক বিবৃতিতে সামান্তা বলেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। দলটির সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
সামান্তা শারমিন বলেন, গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দলের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। দল ভুল পথে গেলে তা থেকে ফিরিয়ে আনা নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেই তিনি অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
তবে এনসিপি দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারবে বলে মনে করেন না তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় পদত্যাগ করলে বিষয়টি সহজে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু দল ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিলেও পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী নন।
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামান্তা শারমিনের প্রথম অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের মাধ্যমে এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে গেছে। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহারের প্রয়োজন থেকেই দলটি সংস্কারের কথা বলে। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সামান্তার মতে, এনসিপি জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী মনে করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ দলটির রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এনসিপির নিজস্ব অবস্থানের পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন না হয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরিয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পরিণত করেছে।
তাঁর অভিযোগ, এনসিপির সামনে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দলটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও এনসিপি আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারত। এ বিষয়ে পাঁচটি বিকল্প পদ্ধতির কথা দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে সামান্তা বলেন, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর কাছে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে।
নারীর অধিকার ও নেতৃত্বের প্রশ্নেও অসন্তোষ
এনসিপির বিরুদ্ধে সামান্তা শারমিনের আরেকটি বড় অভিযোগ, দলটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধের অংশীদার ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই প্রবণতার অনুসারী হয়েছে।
তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দলটি সেই পথ অনুসরণ করেনি।
সামান্তা প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনের সময় নারীদের সাহস ও ত্যাগ গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হলে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়?
এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর অভিযোগ, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করার মধ্য দিয়ে দলটি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চার পুনরাবৃত্তি করেছে।
তিনি বলেন, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন। কিন্তু কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উত্তরা / এ এম

