উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

হাসিনার ফেরা ঘিরে শিক্ষাভবনে ফ্যাসিস্ট প্রকৌশলীদের গোপন বৈঠক আয়োজন

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৫ অপরাহ্ণ
হাসিনার ফেরা ঘিরে শিক্ষাভবনে ফ্যাসিস্ট প্রকৌশলীদের গোপন বৈঠক আয়োজন

পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা ঘিরে দেশের রাজনীতিতে চলছে নানা গুঞ্জন। এর মধ্যেই শিক্ষাভবনে গোপন বৈঠকে বসার আয়োজন সম্পন্ন করেছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কিছু ফ্যাসিস্ট প্রকৌশলীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নাম ব্যবহার করে মূলত আওয়ামী লীগপন্থি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতারা গোপন এ বৈঠকের আয়োজন করেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কনফারেন্স রুমে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা ও সহকারী প্রকৌশলী জারজিসুর রহমান এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ফ্যাসিস্টের সহযোগী জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের ঘনিষ্ঠ আবু সাঈদ আকন্দ তথা শিমুল আকন্দ এ গোপন বৈঠক আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ইইডি সূত্র জানায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির ফ্যাসিস্ট নেতাদের এ গোপন বৈঠক সফল করতে খোদ প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী সহযোগিতা করছেন। তিনি নিয়ম-বর্হিভূতভাবে ইইডির কনফারেন্স রুমে এ গোপন বৈঠক করার অনুমোদন দিয়েছেন।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী নিজেও আওয়ামী লীগ আমলে গোপালগঞ্জে টানা ৫ বছরের বেশি সময় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। এ কারণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ফ্যাসিস্টরা সরব থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী নীরব। সব জেনেও তিনি চুপ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) কর্মরত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির ২০২৬-২৮ মেয়াদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের চতুর্থ মাসিক সভা ডাকা হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টায় এ সভা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সভা ঘিরে সদস্যদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানা যায়, ‘অদৃশ্য’ কারণে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির কার্যালয় এড়িয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে এ সভা করতে মরিয়া সমিতির নেতারা। এজন্য বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে তারা অনুমোদনও চেয়েছেন। তবে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভা ইইডির কনফারেন্স রুমে করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ইইডির কর্মকর্তারা।

পাশাপাশি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির বর্তমান কমিটির নেতাদের অনেকে আগে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা থাকায় তাদের অংশগ্রহণ প্রশ্নে এ সভা ঘিরে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সভায় সমিতির বিএনপিপন্থি সদস্যরা অংশ নিতে আগ্রহী নন। তাদেরকে সভায় অংশ নিতে ঢাকা আসতে নেতারা চাপ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।

সমিতির সভা কেন ইইডির কনফারেন্স রুমে: 

গত ১৭ অক্টোবর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভা আহ্বান করে নোটিশ দেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবু সাঈদ আকন্দ। তাতে ৩১ অক্টোবর সমিতির কার্যালয়ে এ সভা হবে বলে জানানো হয়। হঠাৎ তা পরিবর্তন করে ইইডির কনফারেন্স রুমে করার সিদ্ধান্ত নেন সভাপতি জারজিসুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ আকন্দসহ কয়েকজন নেতা। তারা এ বিষয়ে অনুমোদন নিতে ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে যান। প্রধান প্রকৌশলী মৌখিকভাবে তাতে সম্মতিও দেন।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির বর্তমান কমিটির বিএনপিপন্থি একজন নেতা নাম প্রকাশ না করে জানান, সমিতির কার্যালয়ে সভা করলে বিএনপিপন্থি ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদে থাকা দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি অনেক সদস্যের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছিল না। বিষয়টিকে গুরুত্ব বাড়াতে এবং প্রধান প্রকৌশলী সভার বিষয়ে অবগত আছেন, বোঝাতে ইইডির কনফারেন্স রুমে সভা করার সিদ্ধান্ত নেন কয়েকজন নেতা।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা প্রধান প্রকৌশলীর কাছে গিয়েছিলাম। ইইডির কনফারেন্স রুমে সভা করার বিষয়ে তার কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনে প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে অন্তত ৬-৭ বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তাকে ‘ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভা করতে ইইডির কনফারেন্স রুম বরাদ্দে নিয়মের ব্যত্যয় হচ্ছে কি না’- এমন প্রশ্ন লিখে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

পদোন্নতি-চলতি দায়িত্ব-গাড়ি বরাদ্দের প্রলোভন!

সমিতির সভার আলোচ্যসূচিতে পদোন্নতি, চলতি দায়িত্ব প্রদান, চাকরি স্থায়ীকরণ, প্রশিক্ষণ, কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি বরাদ্দসহ নানা আর্থিক বিষয় রাখা হয়েছে। এ আলোচ্যসূচি ঘিরেও নানা প্রশ্নের তৈরি হয়েছে।

সমিতির কয়েকজন সদস্য জানান, আলোচ্যসূচিতে চার জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্যপদে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হবে। সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ও সহকারী প্রকৌশলীর শূন্যপদে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হবে।

তাদের অভিযোগ, মূলত এ আলোচনার মাধ্যমে পদোন্নতির আশ্বাসে বড় বাণিজ্য করার পাঁয়তারা করছেন সমিতির শীর্ষ কয়েকজন নেতা। নির্বাচনের পর থেকে সমিতির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। বিশেষ উদ্দেশ্যে হঠাৎ সভা করার তোড়জোড় করছেন নেতারা।

সভায় অংশ নিতে অনাগ্রহ, ক্ষুব্ধ সদস্যরা:

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতারা নেতৃত্বে থাকায় ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির এ সভায় অংশ নিতে অধিকাংশ সদস্যই অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের অনেকে ক্ষুব্ধ। তবে প্রধান প্রকৌশলীর ‘সম্মতি’ রয়েছে জানিয়ে সদস্যরা এ সভায় অংশ নিতে জোর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। পাশাপাশি সভায় অংশ না নিলে বদলির ভয়ও দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বদলি ও হেনস্থার ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির ১৭তম ব্যাচের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রায় এক বছর আগে গঠিত সমিতির কমিটি কোনো ধরনের মিটিং করতে পারেনি। গত ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েও তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন আবার মিটিংয়ের নামে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য করতে এ সভা ডেকেছেন।

সমিতির ১৮তম এক কর্মকর্তার অভিযোগ, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বললেই চলে। সদস্যদের বদলির ভয় দেখিয়ে মিটিংয়ে জোরপূর্বক আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সভা করতে প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা আছে বলে প্রচার চালানো হচ্ছে।

২২তম ব্যাচের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির বর্তমান কমিটির প্রধান নেতৃবৃন্দ ফ্যাসিস্টের দোসর। তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য সমিতিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে।’

ডিপ্লোমা সমিতি যেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের ছায়া সংগঠন!

ডিপ্লোমা প্রকৌশল সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. জারজিসুর রহমান। তিনি বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। এছাড়া সমিতির নির্বাহী সদস্য গোলাম সাকলাইন বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের অর্থ সম্পাদক ছিলেন।

পাশাপাশি আব্দুর রহিম রাসেল, মোসাম্মৎ রুবিনা আক্তার, আতিকুর রহমান তালুকদার, রেজাউল হক, দেওয়ান মো. খসরু, রাজিয়া সুলতানাসহ অনেক সদস্য বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক নেতা। তাদের সকল কমিটির তালিকা প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিষয়গুলো নিয়ে জানতে সমিতির সভাপতি মো. জারজিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

Read more — রাজনীতি
Home