উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিনে রাজশাহীতে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ অপরাহ্ণ
ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিনে রাজশাহীতে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি

উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের স্মৃতিবিজড়িত রাজশাহীর পৈতৃক বাড়িতে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। তার ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বুধবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক ও গবেষকেরা এ দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, বাড়িটি সংরক্ষণের সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাড়িটির অবশিষ্ট তিনটি কক্ষও ভেঙে ফেলা হয়।

 

নগরীর মিয়াপাড়ায় ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ির স্থানে বর্তমানে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অবস্থিত। গতকাল বুধবার সেখানে ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ঋত্বিকের সঙ্গে বাড়িটির পারিবারিক সম্পর্ক সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষা করা যায়নি। এমনকি সংরক্ষণের জন্য গণপূর্ত বিভাগ প্রায় ৫১ লাখ টাকার একটি পরিকল্পনাও তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।

 

ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসন মাসুম বলেন, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো ওই বাড়িতে অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা বাড়িটি সংরক্ষণের আন্দোলন শুরু করেন। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ঋত্বিকের চলচ্চিত্রকর্মের প্রচার এবং রাজশাহীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই ছিল সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।

 

তিনি বলেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুল জলিলের উদ্যোগে গঠিত একটি কমিটি বাড়িটির মালিকানা ও ঋত্বিকের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করে। ভূমি রেকর্ডে বাড়িটি ঋত্বিকের মা ইন্দুবালা দেবীর নামে নিবন্ধিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া তাঁর যমজ বোন প্রীতিতি দেবীর মালিকানাসংক্রান্ত নথিও উপস্থাপন করা হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে বাড়িটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় গণপূর্ত বিভাগকে। প্রায় ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা তৈরি হলেও তা বাস্তবায়নের আগেই বাড়িটির শেষ অবশিষ্ট তিনটি কক্ষ ভেঙে ফেলা হয়।

বাড়ি ভাঙার ঘটনায় পরবর্তী তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মাহমুদ হোসন মাসুম। ওই তদন্তে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে দায়ী করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানান। একই সঙ্গে সেখানে ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিসৌধ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

 

তিনি বলেন, তাঁরা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ সরিয়ে দেওয়ার দাবি করছেন না। শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেই সেখানে ঋত্বিক ঘটকের নামে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা সম্ভব। এতে মিলনায়তন, গবেষণাকেন্দ্র, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা এবং তরুণদের নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ থাকবে।

১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে রাজশাহীতে। তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ (ইন্টারমিডিয়েট) পাস করেন। কলেজজীবনেই নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার রাজশাহী ছেড়ে চলে যায়। দেশভাগ, বাস্তুচ্যুতি, শেকড় হারানোর বেদনা ও প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

 

রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিখা সরকার বলেন, ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘অযান্ত্রিক’ ও ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ চলচ্চিত্রে মানুষের বেদনা, বাস্তুচ্যুতি এবং মর্যাদার জন্য সংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর জীবন ও কর্মের স্মৃতি সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। রাজশাহীতে তাঁর নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্ম তাঁর সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

 

রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুয়েল কিবরিয়া বলেন, রাজশাহীর সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের গভীর সম্পর্ক থাকলেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই তা জানে না। দেশভাগের পর রাজশাহী ছেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর চলচ্চিত্রে বিচ্ছেদ, শেকড় হারানো ও বাস্তুচ্যুতির যে বেদনা ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রাজশাহীতে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

স্থানীয় নাট্যকর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, দেশভাগের পর তাঁর বাবা-মা যৌথ পরিবারের অংশ হিসেবে ঋত্বিকদের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করেছেন। তাঁর বোনদের কাছেও ঋত্বিক ও ওই বাড়ির পারিবারিক স্মৃতি রয়েছে। অথচ রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের অনেক শিক্ষার্থীই ঋত্বিকের সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক সম্পর্কে জানে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাঁর জীবন ও কর্ম অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

 

জেলা কালচারাল অফিসারও রাজশাহীতে ঋত্বিক ঘটকের নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে সমর্থন করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে চলচ্চিত্র গবেষণা, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।

ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃত। দেশভাগ ও বাস্তুচ্যুতির মানবিক বিপর্যয় নিয়ে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্র আজও চলচ্চিত্র গবেষক ও দর্শকদের কাছে সমানভাবে আলোচিত। এমন একজন বিশ্বমানের চলচ্চিত্রকারের জন্ম ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত রাজশাহীতে তাঁর নামে একটি চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। তবে পৈতৃক বাড়ির শেষ চিহ্নটুকু হারিয়ে যাওয়ার পর সেই দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।

 

উত্তরা / এ এম 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home