
রাজশাহীতে চর ও তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ডুবিয়ে এখন কমতে শুরু করেছে পদ্মার পানি। নদীর বুক থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে প্লাবনের পানি। কিন্তু রাজশাহীর চরাঞ্চলের মানুষের আতঙ্ক কাটেনি। কয়েক দিনের টানা পানি বৃদ্ধিতে ঘরবাড়ি ও জনপদে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তা পুরোপুরি কাটেনি। বরং পানির সঙ্গে ভেসে আসা কিংবা নিচু এলাকা থেকে উঠে আসা সাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর পানি বাড়ায় নিচু এলাকা থেকে বিষধর রাসেল ভাইপারসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উঠে আসছে লোকালয় ও বসতবাড়ির কাছাকাছি। রাজশাহী নগরীর সীমান্ত অবকাশ এলাকাতেও গত কয়েক দিনে একাধিক বড় সাপ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পানির উচ্চতা কমার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক বলেন, সোমবার বিকাল ৩টায় রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৮ মিটার। আগের দিন রোববার একই সময়ে ছিল ১৭ দশমিক ২৯ মিটার। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৩৩ মিটার। অর্থাৎ গত দুই দিনে পদ্মার পানি প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার হওয়ায় নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার মাত্র ৭৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জানা যায়, বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কয়েক দিন ধরে দ্রুত বাড়ছিল পদ্মার পানি। এতে রাজশাহী নগরীর পাশের ভারত সীমান্তঘেঁষা চর খিদিরপুর, খানপুরসহ নদীর ওপারের বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও বসতঘরের উঠানে পানি উঠেছে, কোথাও চলাচলের পথ তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। এখন পানি কিছুটা কমলেও ঘরে ফেরার ক্ষেত্রে নতুন করে সাপের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সীমান্ত অবকাশ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিনে তারা একাধিক সাপ দেখেছেন। তাদের ধারণা, পানি বাড়ায় নিচু জায়গা থেকে সাপগুলো উঁচু ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে উঠে এসেছে। পরে সেখান থেকে সাপ লোকালয় ও বসতবাড়ির আশপাশে চলে আসায় মানুষের ভয় বেড়েছে।
রমজান আলী ওরেঞ্জ নামে এক যুবক জানায়, পানির মধ্য থেকে বড় একটি সাপ উঠে আসতে দেখেছি। পরে ঘাটের কাছে সাপটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়রা সেটি মেরে ফেলেন।
পদ্মার টি-বাঁধ এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা খাতুন বলেন, তিনিও একটি বড় সাপ দেখেছেন। সেটিকে মারার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সাপটি চলে যায়। পানি বাড়ার কারণে নদী ও আশপাশের নিচু জায়গা থেকে সাপগুলো উঁচু স্থানে উঠে আসছে। সেখান থেকে লোকালয়ের দিকে চলে আসায় মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে।
সাপের আতঙ্কের মধ্যে সাপে কাটার রোগীদের চিকিৎসা প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের জন্য অ্যান্টিভেনম মজুদ রয়েছে। সাপে কাটা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং অ্যান্টিভেনম বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ বলেন, সাপে কাটা রোগীদের হাসপাতালের ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে ১৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মোট এক হাজার ৪৫৩ জন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৩৯ জনকে বিষাক্ত সাপ দংশন করেছে। এদের মধ্যে ১১ জন মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে পাঁচজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে বিষাক্ত সাপে দংশন করেছে।
তিনি বলেন, রাজশাহীতে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যেসব জায়গায় অ্যান্টিভেনম উদ্বৃত্ত ছিল, সেসব জায়গা থেকে এনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মজুদ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে। সাপে কাটা রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অ্যান্টিভেনমও বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
পানিবন্দি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘ সময় পানিতে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে পানি কমে যাওয়ার পরও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শাহিদুল ইসলাম বলেন, পদ্মার পানি কমছে—এটাই আপাতত স্বস্তির খবর। কিন্তু চরাঞ্চলের মানুষের কাছে বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পানি নামার সঙ্গে যোগ হয়েছে সাপের আতঙ্ক, পানিবাহিত রোগের শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা। তাই পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। আকস্মিক বন্যার ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণও শুরু হয়েছে।
এদিকে পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকায় নগরীর টি-বাঁধ এলাকায় সতর্কতা বহাল রয়েছে। জনপ্রিয় এই বিনোদনকেন্দ্রে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে জরুরি সতর্কতা হিসেবে টি-বাঁধ এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ বা জড়ো না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিকাল কিংবা সন্ধ্যায় যেখানে পদ্মার পাড়ে মানুষের ভিড় জমে, সেখানে এখন নীরবতা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি নগর রক্ষা বাঁধ ও নদীতীরবর্তী অন্যান্য অবকাঠামোর পরিস্থিতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

