
বাথরুমের আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ হলো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও জীবাণুর বংশবৃদ্ধির আঁতুড়ঘর।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধির এক অন্যতম মৌলিক অংশ। কিন্তু সেই দাঁত মাজার টুথব্রাশটি আপনি কোথায় রাখছেন?
আমাদের মধ্যে সিংহভাগ মানুষই শৌচাগার বা বাথরুমের বেসিন, আয়নার পেছনের ক্যাবিনেট কিংবা জানালার তাকে টুথব্রাশ রেখে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে একে খুব সুবিধাজনক ও স্বাভাবিক মনে হলেও, অণুজীববিজ্ঞানী ও দন্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মারাত্মক এক স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ভুল।
বাথরুমে খোলা অবস্থায় টুথব্রাশ রাখলে সেখানে কী কী মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া জমা হতে পারে এবং এর ফলে শরীরে কোন কোন রোগ বাসা বাঁধতে পারে, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত সচেতনতামূলক প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
বাথরুমে টুথব্রাশ রাখার প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সমস্যা
'টয়লেট প্লুম' এবং মলদ্বারের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: বাথরুমে টুথব্রাশ রাখার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদটি যুক্ত কমোড বা টয়লেট ফ্ল্যাশের সঙ্গে। কমোডের ঢাকনা না আটকে যখনই ফ্ল্যাশ করা হয়, তখন জলের ঘূর্ণায়মান চাপে বাতাসে অণুবীক্ষণিক তরল বিন্দু বা অ্যারোসল ছিটকে ওঠে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টয়লেট প্লুম’ নামে পরিচিত। এই সূক্ষ্ম জলের কণার সঙ্গে মলদ্বারে থাকা মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া যেমন- ই. কোলাই, সালমোনেলা এবং স্ট্যাফিলোকক্কাস ছিটকে এসে বাথরুমের ৫ থেকে ৬ ফুটের মধ্যে থাকা টুথব্রাশের ব্রিসলে জমা হয়। সেই ব্রাশ মুখে দেওয়ার অর্থ হলো সরাসরি ওই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে শরীরে প্রবেশ করতে দেওয়া।
সেঁতসেঁতে পরিবেশে ফাঙ্গাস ও ছাতার বংশবৃদ্ধি: বাথরুমের বাতাস সবসময় অতিরিক্ত আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে থাকে, যেখানে কোনো সুবাতাস বা সূর্যালোক সহজে প্রবেশ করতে পারে না। ব্রাশ করার পর টুথব্রাশের ব্রিসল যদি সঠিকভাবে না শুকায়, তবে সেখানে 'অ্যাসপারগিলস' বা 'ক্যান্ডিডা'-র মতো ক্ষতিকর ফাঙ্গাস ও ছাতা জমে যায়। এই ফাঙ্গাসযুক্ত ব্রাশ মুখে ব্যবহার করলে মুখের ঘা, পেটের ইনফেকশন এবং ফুসফুসের অ্যালার্জি হতে পারে।
পরিবারের এক সদস্য থেকে অন্য সদস্যের সংক্রামক রোগ: বাথরুমের বেসিনে একটিমাত্র ব্রাশ হোল্ডারে যদি পরিবারের সবার টুথব্রাশ একসঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা হয়, তবে খুব সহজেই একজনের মুখের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাল ইনফেকশন অন্যজনের ব্রাশে স্থানান্তরিত হয়। ফলে পরিবারের একজন সদস্য সর্দি, কাশি, মাড়ির ইনফেকশন বা ফ্লু-তে আক্রান্ত হলে তা দ্রুত অন্য সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বাথরুম পরিষ্কারের রাসায়নিক সাবান ও ফিনাইলের স্পর্শ: বাথরুম বা টয়লেট পরিষ্কারের সময় যেসব কড়া কেমিক্যাল, এয়ার ফ্রেশনার বা ফিনাইল স্প্রে ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সূক্ষ্ম রাসায়নিক কণা বাতাসে ভেসে গিয়ে বেসিনের ওপর থাকা খোলা টুথব্রাশের গায়ে জমা হয়। এই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পেটে গেলে দীর্ঘমেয়াদে পেটের রোগ ও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
টুথব্রাশ জীবাণুমুক্ত ও সুরক্ষিত রাখার সহজ উপায়
ফ্ল্যাশ করার আগে কমোডের ঢাকনা বন্ধ করা: টয়লেট ব্যবহারের পর ফ্ল্যাশ করার সময় সর্বদা কমোডের ঢাকনা (লিড) নামিয়ে বন্ধ করুন, যাতে বাতাসে জীবাণু ছড়াতে না পারে।
বাথরুমের বাইরে ব্রাশ রাখা: সম্ভব হলে বাথরুমের ভেতরের সেঁতসেঁতে পরিবেশ ছেড়ে ঘরের শোবার ঘরের বাতাস চলাচলকারী পরিষ্কার টেবিলে বা ক্যাবিনেটে টুথব্রাশ রাখুন।
ব্রাশ হোল্ডারের দূরত্ব ও ঢাকনাযুক্ত ক্যাপ: যদি বাথরুমেই ব্রাশ রাখতে হয়, তবে তা কমোড থেকে অন্তত ৬ ফুট দূরে এয়ারেটেড বা ছিদ্রযুক্ত ক্যাপ দিয়ে ঢেকে রাখুন। কখনো প্লাস্টিকের এয়ার-টাইট কন্টেইনারে ভেজা ব্রাশ রাখবেন না, এতে ফাঙ্গাস আরও দ্রুত বাড়ে।
প্রতি ৩ মাস অন্তর ব্রাশ পরিবর্তন: দীর্ঘদিন একই টুথব্রাশ ব্যবহার না করে প্রতি ২ থেকে ৩ মাস পর পর অথবা যেকোনো অসুস্থতার পর পুরনো ব্রাশ ফেলে দিয়ে নতুন টুথব্রাশ ব্যবহার করা উচিত।
মুখের ভেতরের হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতাই আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার চাবিকাঠি। সামান্য অসচেতনতার কারণে প্রতিদিন সকালে জীবাণুযুক্ত ব্রাশ মুখে দেওয়ার মতো বিপদ এড়াতে আজই বাথরুমে খোলা টুথব্রাশ রাখার অভ্যাস বদলে ফেলুন।
উত্তরা/এএইচ

