
পুলিশে এখনো সক্রিয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ চক্রের সদস্যরা। তারা পলাতক ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কাছে বাহিনীর স্পর্শকাতর গোপন তথ্য পাচার করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত— এমন দুশর বেশি পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা।
তাদের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ছাড়াও এই বলয়ের বড় একটি অংশ একসময় পলাতক কর্মকর্তাদের বডিগার্ড, গাড়িচালক, অর্ডারলি হিসেবে কাজ করতেন। আবার তাদের অতিঘনিষ্ঠ হিসেবে ‘বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট’ তামিলের কাজ করতেন— এমন সদস্যও রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে গেলেও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইউনিটে বহাল রয়েছেন তাদের ঘনিষ্ঠরা। শুধু তা-ই নয়, তাদের পছন্দের জায়গায় পদায়ন করাতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কেউ কেউ তদবির করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রী-এমপিদের ডিও লেটারও।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের ঘনিষ্ঠরা এখন পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তারা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থেকে তথ্য পাচার করছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশ-বিদেশে সরকারবিরোধী ন্যারেটিভ তৈরির ‘মসলা’র জোগান দিচ্ছেন।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভাগীয়ভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মরতদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পলাতক সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে— এমন অন্তত ২০ জনের বদলি ঠেকাতে সরকারের একাধিক মন্ত্রী-এমপি তদবির করেছেন। তদবিরকারীদের তালিকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করা না হলেই দেশ-বিদেশে অবস্থানরত স্যোশাল অ্যাকটিভিস্টদের মাধ্যমে নানা ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সিন্ডিকেট কানেকশনের তালিকায় অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য রয়েছেন, যারা পলাতক কর্মকর্তাদের গাড়িচালক ও বডিগার্ড ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে যাওয়া কর্মকর্তারা অনেক দিন চুপচাপ থাকলেও এখন তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক চাঙ্গা। বাহিনীর ভেতরে তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিভিন্ন ফেসবুক পেজে লাইভ সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন সাবেক এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম। তার কিছু বক্তব্য নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এখনো বহাল দোসররা: জানা গেছে, পলাতকদের ঘনিষ্ঠরা এখনো পুলিশ সদর দপ্তর, ডিবি, এসবি, সিআইডি, এপিবিএন ও র্যাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ তালিকায় রয়েছেন সদর দপ্তরের ডিআইজি অপারেশন (১৭ ব্যাচের কর্মকর্তা) রেজাউল করিম। তিনি হাসিনা সরকারের সময় এআইজি প্রশাসন, অতিরিক্ত ডিআইজি স্পেশাল ক্রাইমের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি বিএনপিবিরোধী ন্যারেটিভ সৃষ্টির অন্যতম কারিগর ছিলেন। সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের ভাইয়ের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা ও দুদকে দুর্নীতির অভিযোগে পদোন্নতি আটকে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বঞ্চিত দাবি করে পদোন্নতি ও ডিআইজি অপারেশন পদে পদায়ন নেন। পুলিশে চাকরিরত বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রেজাউল করিম এআইজি প্রশাসন থাকাকালে হাবিব, প্রলয় ও বিপ্লবের যোগসাজশে খালেদা জিয়ার হাতে লাগানো স্মৃতিচিহ্ন দুটি কাঠবাদামগাছ কেটে ফেলাসহ নানা বিতর্কিত কাণ্ডে জড়িত।
সাবেক এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ ২৫তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান দিপু কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় ডিবিতে এবং কক্সবাজারের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি এপিবিএনে কর্মরত। আরেক ঘনিষ্ঠ চাঁদপুরের সাবেক এসপি সাইফুল বর্তমানে সারদায় এসপি (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ২৪ ব্যাচের অতিরিক্ত ডিআইজি আসমা সিদ্দিকা মিলিকে প্রথমে রংপুরে বদলি করা হলেও ফের ঢাকার সিআইডি ট্রেনিং স্কুলে বদলি হয়ে আসেন। একই ব্যাচের অতিরিক্ত ডিআইজি মহিবুল ইসলাম এটিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। মনির-ঘনিষ্ঠ ২৭ ব্যাচের মাহফুজা লিজা বর্তমানে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় রয়েছেন। একই ব্যাচের এসপি নাজমুল হক, ২৮ ব্যাচের জাহাঙ্গীর আলম, আশরাফুজ্জামান, ২১ ব্যাচের ড. কামরুজ্জামান এবং ২৫ ব্যাচের এ এফ এম কিবরিয়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৪ বছর সদর দপ্তরে: প্রায় ১৪ বছর পুলিশ সদর দপ্তর আঁকড়ে থাকা ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তা ইশতিয়াকুর রশীদ বর্তমানে আছেন এলআইসি শাখায়। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোন নাম্বার ট্র্যাকিং এবং কল রেকর্ড সংগ্রহ করা হতো। এ ছাড়া ৩১তম বিসিএসের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাহুল পাটোয়ারী সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তার পোস্টিং ১২ এপিবিএনে। রাহুল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক আপ্যায়ন সম্পাদক। বাবা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র। একই ব্যাচের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ডিবিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। চরম বিতর্কিত তৎকালে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে খিলগাঁও ও মতিঝিল জোনে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনিও আছেন ১২ এপিবিএনে। এ ছাড়া হারুনের ‘মিডিয়া উইং’ সামলাতেন জোনায়েদ। ৩০ বিসিএসের এই কর্মকর্তা ছিলেন হারুনের অঘোষিত এপিএস। তার শ্বশুর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দীন সিরাজ।
মোশতাককে ঘিরে প্রশ্ন: ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোশতাক সরকারও সাবেক ডিআইজি হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, হারুন নিজের স্বার্থ রক্ষায় তাকে কিশোরগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করিয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর ২৫ ব্যাচের একজনের মাধ্যমে বিএনপিপন্থী কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে তার নতুন করে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়েছে।
সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের ঘনিষ্ঠ ৩১ ব্যাচের আনিছ উদ্দিন বাহাদুর মিঠু ডিবিতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির খসড়ায় যোগাযোগ সম্পাদক পদে নাম ছিল তার। বর্তমানে তিনি র্যাব-১-এ কর্মরত। একই ব্যাচের মহিদুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। দীর্ঘ সময় ডিবিতে কাজ করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি র্যাব-৪-এ দায়িত্ব পালন করছেন।
বিতর্কিত আরও যারা: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে পরিচিত এ এফ এম নিজাম উদ্দীন বর্তমানে রয়েছেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায়। হাবিবুর-ঘনিষ্ঠ মিজানুর রহমান শেলী এখন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার। সাবেক এসবিপ্রধান মনিরুল-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত ডিআইজি হাসানুল জাহিদ বর্তমানে সারদায় সংযুক্ত। এ ছাড়া সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও নানা অভিযোগ এসেছে। বিতর্ক আছে ২৪ ব্যাচের অতিরিক্ত ডিআইজি আইয়ুব আলীর কানেকশন নিয়েও। তিনি ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের একজন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ নিয়ে নেতিবাচক ন্যারেটিভ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন পলাতকরা। একপেশে তথ্য ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের পরিকল্পনাও করছেন তারা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেপর্যন্ত দেশে নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামের জঙ্গি সংগঠন সামনে আনা হয়েছিল। তার সেই কানেকশনগুলো ফের চাঙ্গা করে ভয়ংকর ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কা করছে একাধিক সংস্থা।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম গণমাধ্যমকে বললেন, কেউ তথ্য পাচারের মতো গর্হিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে বরখাস্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ হাসিনা সরকারের আমলে অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে ছাত্রজীবনে বিএনপি-জামায়াত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার দোহাই দিয়ে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া শুধু অনুমানসাপেক্ষে কাউকে হেনস্তা কিংবা চাকরিচ্যুত করা ঠিক হবে না। তিনি আরও বললেন, বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও বাড়ানো উচিত। ব্যক্তিগত রেষারেষিকে কোনোভাবে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। এতে বাহিনীর পরিবেশ নষ্ট ও সদস্যদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে।

