
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিধিমালায় একগুচ্ছ পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত ফেরত পাওয়ার শর্ত হচ্ছে আরও কঠোর। এক্ষেত্রে প্রদত্ত ভোটের ন্যূনতম ১২ শতাংশের বদলে ১৫ শতাংশ পাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত। বাড়ানো হচ্ছে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের সীমাও।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানালেন, বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে মূলত দুটি বিষয় রয়েছে— প্রার্থীদের জামানত বৃদ্ধি এবং জামানত ফেরত পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের হার বাড়ানো। এ ছাড়া টুকিটাকি পরিবর্তনও করা হচ্ছে।
জামানতের বিষয়ে তিনি বললেন, ‘চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২৫ হাজার এবং সদস্য প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে চেয়ারম্যান পদে জামানত ছিল ৫ হাজার টাকা। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্যপদে জামানত ছিল ১ হাজার টাকা।’
জামানত ফেরত প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, আগে প্রদত্ত ভোটের ১২ শতাংশ পাওয়ার বিধান ছিল। সেটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। রহমানেল মাছউদ আরও জানালেন, বিধিমালার খসড়া এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। প্রক্রিয়া শেষে এসআরও নাম্বার দিয়ে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
অবশ্য ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব প্রার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মনিরা খান বললেন, ‘জামানত ২৫ হাজার টাকা করা হলে অন্যান্য খরচও যদি একই হারে বাড়ে, তাহলে বিষয়টি প্রার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তবে জামানতের অর্থ যদি প্রার্থীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে এর একটি ইতিবাচক দিক থাকতে পারে।’
মনিরা খানের ভাষ্য, ‘শুধু নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে— এমন বিধানের পাশাপাশি নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও জামানত বাজেয়াপ্তের বিধান রাখা হলে তা অর্থবহ হতে পারে।’
ফেমার সভাপতি বললেন, ‘বর্তমানে ২৫ হাজার টাকা জামানত খুব বড় অঙ্ক নয়। তবে জামানত বৃদ্ধির বিষয়টি তখনই অর্থপূর্ণ হবে, যখন এর সঙ্গে প্রার্থীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে পোস্টার, দেয়াললিখন, মিটিং-মিছিলসহ নির্বাচনী প্রচারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর বিধান করা গেলে প্রার্থীদের সামগ্রিক নির্বাচনী খরচও কমানো সম্ভব। অন্যথায় শুধু জামানত বাড়িয়ে প্রার্থীদের খরচ বাড়ানো উচিত হবে না।’
বিধিমালায় যেসব পরিবর্তন: প্রস্তাবিত সংশোধনীতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ১০ লাখ ও সদস্য প্রার্থীর ব্যয় ২ লাখ টাকা নির্ধারণ প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি, ভীতিপ্রদর্শন কিংবা দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোটদানের ক্ষেত্রে সহায়তার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ভোটার কীভাবে সহায়তা পাবেন, তা বিধিমালায় নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা তদারকিতে কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও এর আওতায় থাকবে।
নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হলে তদন্তসাপেক্ষে ফলাফল স্থগিত রাখার বিধান আনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রয়োজন হলে আবার ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিধিমালা বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
আজ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত নেওয়ার পর সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে তিনি বললেন, এগুলো এখনো ‘টেন্টেটিভ ডেট’ বা সম্ভাব্য তারিখ। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার আলোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করবে ইসি: ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে চলতি মাসে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে নির্বাচনের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করবে। এ ছাড়া আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর তিন ধাপে এই সংলাপ হতে পারে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

