
আয়ু বৃদ্ধিকারী হিসেবে প্রশংসিত ডায়াবেটিসের একটি বহুল আলোচিত ওষুধ হয়তো প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। কয়েক দশক পুরোনো ওষুধ মেটফরমিনকে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা, লং কোভিডের ঝুঁকি কমানো থেকে শুরু করে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করার মতো বিভিন্ন কারণে প্রশংসিত করা হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেল জার্নাল জেএএমএ-তে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দুই দশক ধরে পর্যবেক্ষণে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে অন্য একটি পদ্ধতি আরও ভালো কাজ করেছে। এই ফলাফলগুলো এসেছে যুগান্তকারী ডায়াবেটিস প্রিভেনশন প্রোগ্রাম (ডিপিপি) এবং এর পরবর্তী গবেষণা, ডায়াবেটিস প্রিভেনশন প্রোগ্রাম আউটকামস স্টাডির (ডিপিপিওএস) অংশগ্রহণকারীদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এতে ১৯৯৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর নজর রাখা হয়েছিল। কঠোর ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গবেষকরা দেখেছেন, প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে জীবনযাত্রার পরিবর্তন- বিশেষ করে কম চর্বি ও কম ক্যালরিযুক্ত খাবার এবং প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপ- দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণে একাধিক রোগের প্রকোপ হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
অন্যদিকে, মেটফরমিন প্লেসিবোর চেয়ে ভালো ফল দেয়নি। একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার নাম মাল্টিমরবিডিটি। এই গবেষণায় গবেষকরা মেডিকেয়ার ক্লেইমস ডেটাবেস থেকে ১৫টি সাধারণ রোগ পরীক্ষা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার্স রোগ, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ, হার্ট ফেইলিওর, অস্টিওপোরোসিস এবং স্ট্রোক। মূল প্রোগ্রামটিতে ডায়াবেটিস হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩ হাজার ২৩৪ জন প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
একটি দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ গবেষণা শুরুর আগে অংশগ্রহণকারীদের দৈবচয়নের ভিত্তিতে তিন বছরের জন্য নিবিড় জীবনযাত্রাগত পরিবর্তনমূলক হস্তক্ষেপ, মেটফরমিন অথবা প্লেসিবো দেওয়া হয়। মেডিকেয়ারে নথিভুক্ত এবং ২১ বছর ধরে পর্যবেক্ষণে থাকা ১ হাজার ১৭৩ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে জীবনযাত্রাগত পরিবর্তন আনা দলের ৮২ শতাংশ একাধিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
মেটফরমিন দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৮৫ শতাংশ এবং প্লেসিবো দলের ৮৭ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, এই গবেষণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তব চিকিৎসাক্ষেত্রে একাধিক রোগের বিস্তার প্রতিরোধ বা এর গতি কমানোর প্রচেষ্টা মূলত ব্যর্থ হয়েছে। একবার রোগীদের মধ্যে একাধিক অসুস্থতা জমা হতে শুরু করলে চিকিৎসকদের পক্ষে সেই অগ্রগতিকে কার্যকরভাবে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগগুলো একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলে।
এই চ্যালেঞ্জটি আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে, কারণ গবেষণার লেখকদের ভাষায়, ‘উচ্চ-ব্যয়বহুল রোগের যুগল’ ক্রমেই বাড়ছে। এসব যুগলের মধ্যে রয়েছে হৃদযন্ত্রের বিকলতা ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের সংমিশ্রণ অথবা ক্যান্সারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও জটিলতার একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে, গবেষণাটির লেখকেরা মেটফরমিন এবং জীবনযাত্রাগত পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকেছেন, কারণ উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে এই দুটিই টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর বলে ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।
প্রশ্নটি ছিল, এই দুটি পদ্ধতির কোনোটি কি সেই সুবিধাগুলোকে আরও বিস্তৃত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি বহুবিধ রোগের প্রকোপ কমাতে পারে কি না। নর্থওয়েল হেলথের একজন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ড. শিরিন জাগ্গি, যিনি এই গবেষণায় জড়িত ছিলেন না, এই ফলাফলকে ‘শক্তিশালী’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে তিনি ‘তার রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে এবং তাদের বলতে পারবেন যে, এটি কেবল একটি ট্যাবলেট নয়, যা তাকে দিতে হবে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন সবার জন্য একরকম নয় এবং তা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে খুবই ভিন্ন হতে পারে। তিনি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর পুষ্টি ও শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট

