
চাকরি খুঁজতে গিয়ে অনলাইনে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তই (সিভি) এবার সম্ভাব্য ‘পণ্য’ হয়ে উঠেছে। ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীর সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে ‘ম্যাডর্যাক্স’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। তাদের দাবি, এসব সিভি দেশের জনপ্রিয় চাকরির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের তথ্যভান্ডার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনে সিভিতে থাকা ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যের বিস্তারিত বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। তবে ব্যবহারকারীদের তথ্য বিডিজবস থেকে ফাঁস হয়েছে—হ্যাকার গোষ্ঠীটির এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রবিবার দুপুরে ‘ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ’ নামের একটি ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করে হ্যাকার গোষ্ঠীটি। সেখানে দাবি করা হয়, তাদের হাতে বিডিজবসের ৬০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সিভি রয়েছে। এসব সিভিতে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
শুধু তথ্য থাকার দাবিতেই থেমে থাকেনি গোষ্ঠীটি। এসব তথ্য বিক্রির দরও প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি সিভির একটি কপির দাম এক হাজার মার্কিন ডলার। সর্বোচ্চ পাঁচজন ক্রেতার কাছে এসব তথ্য বিক্রি করা হবে। অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে পেটিএম, ওয়াইজ, পেইউ ও বাইন্যান্সের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
দাবির সত্যতা বোঝাতে হ্যাকাররা ১৪৮টি সিভির নমুনা প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলোর বেশির ভাগই পুরোনো। বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে সর্বশেষ হালনাগাদ করা সিভির সংখ্যা বেশি।
তবে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। প্রকাশিত ১৪৮টি সিভির মধ্যে দুজনের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী। কয়েক বছর আগে তারা বিডিজবসে নিজেদের সিভি আপলোড করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সিভিতে থাকা তথ্য আলাদাভাবে হয়তো খুব বড় কিছু মনে নাও হতে পারে। কিন্তু নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার মতো তথ্য একসঙ্গে চলে গেলে একজন ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিচিতি তৈরি করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, এ ধরনের তথ্য সাইবার অপরাধীদের হাতে গেলে তা ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পরিচয় জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার মতো অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
অর্থাৎ চাকরির জন্য নিজের যোগ্যতা তুলে ধরতে একজন ব্যক্তি যে তথ্য জমা দিয়েছেন, সেটিই পরে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত এসব তথ্য বিডিজবসের তথ্যভান্ডার থেকে ফাঁস হয়েছে—হ্যাকারদের এমন দাবি নাকচ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর।
তিনি বললেন, বিডিজবস শুরু থেকেই ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তথ্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের প্রোফাইল কে দেখতে পারবেন এবং কে দেখতে পারবেন না, সে বিষয়েও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে।
বিডিজবসে নিবন্ধিত লক্ষাধিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য দেখতে পারে জানিয়ে ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, এসব তথ্য তারা শুধু নিজেদের নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারে।
কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এসব তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করলে এবং বিষয়টি বিডিজবসকে জানানো হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত ৬০ লাখ সিভির দাবির উৎস কোথায়, কীভাবে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিজ্ঞাপনদাতা হ্যাকার গোষ্ঠীর দাবি কতটা সত্য—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

