উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

স্ক্রিনটাইম বাড়লে কমবে মস্তিষ্কের ক্ষমতা

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ২০ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ণ
স্ক্রিনটাইম বাড়লে কমবে মস্তিষ্কের ক্ষমতা

প্রযুক্তি ও স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকেই মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত সার্জন জেনারেল এবং স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ড. স্টিফেন হার্লিডোপোলোস সতর্ক করে বলেছেন, ‘শৈশবে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের স্নায়ু-জ্ঞানীয় বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে মনোযোগের অভাব, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং ভাষার দক্ষতা অর্জনে বড় ধরনের স্থায়ী জটিলতা তৈরি হয়।’

 

পারিবারিক জীবনে স্ক্রিন আসক্তি কাটাতে তিনি ‘5 Ds’ নামের একটি কৌশল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।

ঝগড়া বা ঝামেলা হওয়ার আগেই পরিবারের সবাই মিলে বসে স্ক্রিন ব্যবহারের সুস্পষ্ট সময় ও নিয়ম ঠিক করতে হবে। অভিভাবকদের নিজেদেরও স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস শুধরাতে হবে। কারণ, বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকলে সন্তানরাও তা-ই শিখবে। শিশু একঘেয়েমিতে ভুগলে তার হাতে ট্যাব বা ফোন না দিয়ে ছবি আঁকা, হস্তশিল্প বা একসঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরির মতো কাজের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে হবে।

প্রতিদিনের জীবন থেকে নির্দিষ্ট কিছু সময় স্ক্রিনমুক্ত রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেমন খাবারের টেবিলে কথা বলা, গাড়ি চালানোর সময় ফোনে ব্যস্ত না থাকা এবং ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে ব্লু-লাইট নিঃসরণকারী ডিভাইস বন্ধ রাখা।

শিশুদের হাতে স্ক্রিন বা ফোন দেওয়ার প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব দেরিতে শুরু করা উচিত। রাতে সন্তানদের ঘরে ফোন না রেখে রান্নাঘর বা বসার ঘরে সবার সামনে চার্জে রাখার নিয়ম চালু করা যেতে পারে।

 

প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কে কার্যক্ষমতা হ্রাস ও ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’

নিউরোলজিস্টদের মতে, সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা এবং গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা বড়দের মস্তিষ্কেও দীর্ঘমেয়াদে 'কগনিটিভ ডিকলাইন' বা জ্ঞানীয় ক্ষমতা হ্রাসের জন্ম দিচ্ছে।

ছোটখাটো তথ্য, ফোন নম্বর বা হিসাবের জন্য প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করায় ব্রেনের মেমোরি সার্কিটগুলো অব্যবহৃত হয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের মূল নীতি হলো ব্যবহার করুন, নইলে হারান।

 

রিলস বা ছোট ভিডিও থেকে মস্তিষ্ক একধরনের দ্রুত ডোপামিন বা 'মাইক্রো-রিওয়ার্ড' পায়। ক্রমাগত দ্রুতগতির তথ্য গ্রহণ করতে গিয়ে ব্রেন দীর্ঘ সময় কোনো জটিল বিষয় বা কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

স্ক্রিনের ব্লু-লাইট মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়, যা ঘুমের চক্র নষ্ট করে। গভীর ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক তার ভেতরের বর্জ্য পরিষ্কার করে ও স্মৃতি শক্ত করে; ঘুম ব্যাহত হলে ধীরে ধীরে ব্রেনের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে।

স্ক্রিনের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করায় বই পড়া, শারীরিক ব্যায়াম বা মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি যোগাযোগের সময় কমে যাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হওয়া একাকীত্বও অকালে মস্তিষ্ক বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়ার বড় কারণ।

হংকং ইনস্টিটিউট অব ফ্যামিলি এডুকেশন-এর প্রকাশিত একটি নতুন জরিপ অনুযায়ী, হংকংয়ের কিন্ডারগার্টেনপড়ুয়া প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু দিনে অন্তত এক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায়। এছাড়া বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে হওয়া ৮০ শতাংশেরও বেশি বিরোধের মূল কারণ অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম।

জুনিয়র ক্লাসের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং হাইস্কুলের ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী দৈনিক আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়।

হংকংয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ২ থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রিনটাইম নির্ধারিত।

জরিপে দেখা গেছে, ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ কেজি শ্রেণির শিশু এই সীমা অতিক্রম করে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কেবল বিনোদনের জন্য স্ক্রিনে কাটায়।

স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকা বা অতিরিক্ত সময় ধরে মোবাইল-ট্যাব ব্যবহার করায় শতকরা ৮০ ভাগের বেশি পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে তিক্ততা বা ঝগড়ার সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রযুক্তি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এটি যেন বাস্তব জীবনের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিকল্প না হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক সময়ে স্ক্রিন বন্ধ করা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব।

 

Read more — লাইফস্টাইল
Home