উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

দীর্ঘায়ু পেতে দক্ষিণ কোরীয়দের অভ্যাস ও খাবারে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

বিদেশ ডেস্ক ১৭ মে ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ণ
দীর্ঘায়ু পেতে দক্ষিণ কোরীয়দের অভ্যাস ও খাবারে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

 

উন্নত জীবনের লক্ষ্যে অনেকেই হাজারো ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর মাধ্যমে পা রাখেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে, উন্নত জীবনের বাছাইয়ে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কাটাতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকাটাই বেশি ভালো হবে।

 

১৯৮০-এর দশকে উন্নত দেশগুলোর গড় আয়ুর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র মোটামুটি মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল। কিন্তু এরপর বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই তালিকার তলানির দিকে নেমে গেছে। অন্যদিকে বিশ্বের আরেক প্রান্তে, দক্ষিণ কোরিয়ায় গড় আয়ু দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে গড় আয়ু বেড়েছে ৭ দশমিক ৯৪ বছর।

 

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘায়ু পাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ ঠিক কী করছে এবং আমেরিকানরা তাদের কাছ থেকে কী শিখতে পারে, সেটি নিয়ে খোঁজ লাগালে দেখা যায়, এই গড় আয়ুর সাফল্য মূলত নির্ভর করছে কিছু অভ্যাসের ওপর, যা আপনি এখনই নিজের জীবনে যুক্ত করতে পারেন।

 

সব বয়সেই বেশি শাকসবজি

মার্কিন সাংবাদিক কারা সুইশার দক্ষিণ কোরিয়ার একটি স্কুলের মধ্যাহ্নভোজের সময় পরিদর্শনে যান। সে সময় তিনি শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার দেখে অবাক হয়ে যান। সেখানে ছিল লেটুস পাতা দিয়ে মোড়ানো খাবার, মুলা ও পেঁয়াজকলির সালাদ, কিমচি এবং মৌসুমী ফল। সুইশার জানান, তাঁর নিজের ছোট বাচ্চাই তো এ ধরনের খাবার খেতে চাইবে না।

 

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে শিশুদের বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। স্কুলের পুষ্টিবিদ ইয়নজু কিম সুইশারকে জানান, এই খাবারগুলো পুষ্টি ও শিক্ষা উভয় বিষয়ের দিকে লক্ষ রেখে বিশেষভাবে তৈরি করেন একজন পুষ্টিবিদ।

 

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই প্রতিদিন কোনো শাকসবজি খায় না এবং এক-তৃতীয়াংশ শিশু প্রতিদিন কোনো ফল খায় না। অভিভাবকদের ওপর পরিচালিত এক জরিপের বরাতে এই তথ্য জানানো হয়।

 

আর এই সমস্যাটি কেবল খাবার নিয়ে খামখেয়ালি শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও বজায় থাকে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকার প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিম্নমানের খাবার (ডায়েট) গ্রহণ করেন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ডায়েট স্কোরের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের খাবারের মান মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এই স্কোর মূলত এমন খাবারকে প্রধান্য দেয় যাতে প্রচুর ফল ও শাকসবজি, লাল চাল বা গমের (হোল গ্রেইন) তৈরি খাবার, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও চর্বি থাকে এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ খুব কম থাকে।

 

মাইন্ড ডায়েট ও ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসে দীর্ঘজীবন লাভ এবং শেষ বয়সে মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের (কগনিটিভ ডিক্লাইন) ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে জড়িত উপাদানগুলো বেশি থাকে। (মাইন্ড ডায়েট বলতে বোঝায় মেডিটেরানিয়ান-ড্যাশ ইন্টারভেনশন ফর নিউরোডিজেনারেটিভ ডিলে)।

 

স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার সুফল হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে টের পাওয়া কঠিন, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফলাফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

সব ধরনের শারীরিক সক্রিয়তা

সিউলের ইভা ওম্যানস ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের স্নায়ুবিজ্ঞানী (নিউরোলজিস্ট) ডা. গেওন-হা কিম বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সুপারএইজার্স’ অর্থাৎ যেসব বয়স্ক মানুষের মানসিক বা চিন্তাভাবনার সক্ষমতা তাঁদের চেয়ে কয়েক দশকের ছোট মানুষের মতো, তাঁদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু জীবনযাত্রার প্রভাব এর পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। সেগুলো হলো—শারীরিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ ও নতুন কোনো চ্যালেঞ্জিং কাজে যুক্ত থাকা।

 

শারীরিক সক্রিয়তা নিয়ে জানতে সুইশার কথা বলেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় তারকা ‘কোরিয়া গ্র্যান্ডমা’ নামে পরিচিত পার্ক মাক-রিয়ে-এর সঙ্গে। ৭৯ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা ইন্টারনেটে তাঁর স্বাস্থ্যকর রান্নার রেসিপি, ত্বকের যত্ন এবং ব্যায়ামের নিয়মকানুন শেয়ার করেন। সুইশারকে তিনি জানান, এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি তাঁর একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদল রয়েছে, যা তাঁর স্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি।

 

সব ধরনের শারীরিক সক্রিয়তার বিষয়ে পাওয়া তথ্য-উপাত্তগুলো একদম স্পষ্ট।

 

নিয়মিত ব্যায়াম, যা হৃৎস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ায়, তা অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকেন, তাঁদের যেকোনো কারণে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ৩২ শতাংশ বেড়ে যায়। আর চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকা বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করতে পারে।

 

পার্ক বলেন, ‘আমি সারা দিন বন্ধুদের সঙ্গে হেসে কাটাই। অসুস্থ হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।’

 

আগাম সতর্কতামূলক স্বাস্থ্যসেবা

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটি স্বাস্থ্যসেবায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিক হিউন শিন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেন তিনি।

 

ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. কারেন স্টুডার বলেন, ‘কেউ রোগ প্রতিরোধের জন্য টাকা খরচ করতে চায় না।’ আমেরিকার বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চিকিৎসকেরা রোগ নিরাময়ের জন্য অর্থ পান। যেমন, হার্টের বাইপাস সার্জারির জন্য হাজার হাজার ডলারের বিল পাওয়া যায়, কিন্তু যে জীবনযাত্রার অভ্যাসগুলো হার্টের রোগ প্রতিরোধ করতে পারত, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ভিজিট বাবদ খুব সামান্যই দেওয়া হয়।

 

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সামান্য সর্দি বা পিঠব্যথা হলেও মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের কাছে যায় বলে জানান এএফপি সাংবাদিক শিন। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবা সাশ্রয়ী হওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে।

 

স্টুডার বলেন, একজন ব্যক্তির পক্ষে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়, তবে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

 

তিনি পরামর্শ দেন, নিয়মিত টিকা নেওয়া ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা (স্ক্রিনিং) করানো উচিত। সেই সঙ্গে ব্যায়াম (যার মধ্যে শক্তি বাড়ানোর বা স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত), বেশি করে উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ভ্যাপিং, তামাক ও অ্যালকোহল গ্রহণ কমিয়ে দেওয়া বা পুরোপুরি বর্জন করার ওপর জোর দিতে হবে।

 

আর এই পরিবর্তনগুলো হতে পারে দিনে মাত্র একটি বাড়তি সবজি খাওয়া বা একটি কম অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় পানের মতো সাধারণ।

 

স্টুডার আরও বলেন, ‘আপনি ছোট থেকেই শুরু করতে পারেন, এটি জীবনকে আমূল বদলে ফেলার মতো কোনো কঠিন প্রক্রিয়া হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, যদি না আপনি নিজে তা চান। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

Read more — স্বাস্থ্য
Home