উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

বাজার থেকে কেনা প্লাষ্টিকের কৌটায় শিশুদের চিকিৎসা

উত্তরা ডেস্ক ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ণ
বাজার থেকে কেনা প্লাষ্টিকের কৌটায় শিশুদের চিকিৎসা

পাঁচ মাস বয়সী ফাইজাকে ভর্তি করা হয়েছে ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে। তার প্রয়োজন নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অক্সিজেন হুড। তবে সরঞ্জামের অভাবে শিশুটির মাথায় পরানো হয়েছে বাজার থেকে কেনা প্লাস্টিকের কৌটা। সেই কৌটার ছিদ্র দিয়েই তাকে দেওয়া হচ্ছে অক্সিজেন। সন্তানের দিকে তাকিয়ে মা ভাবছেন, এভাবে তার সন্তানকে সুস্থ করা যাবে কি না। এটি কেবল ফাইজার একার চিত্র নয়, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে এখন এভাবেই চিকিৎসা চলছে।

হাসপাতালের শিশু বিভাগে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৪০টি। গতকাল বুধবার পর্যন্ত সেখানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৪৫ জন। বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে বিভাগটিতে প্রয়োজন অন্তত ১১ জন চিকিৎসক। কিন্তু সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র আটজন। এর মধ্যে আবার চারজন বদলির আবেদন করে রেখেছেন। হাসপাতালের সামগ্রিক চিত্রও ভয়াবহ। ১০০০ শয্যার এ হাসপাতালটি চলছে মাত্র ৫০০ শয্যার জনবল দিয়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রায় ৫৯ শতাংশ পদই শূন্য। ২৪৮টি বিশেষজ্ঞ পদের মধ্যে ১৪৬টিই খালি পড়ে আছে।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামো ঘাটতিও পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। শিশু বিভাগের অধীন স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটে (এসএনসিইউ) পর্যাপ্ত অক্সিজেন হুড নেই। বিকল্প হিসেবে বাজার থেকে আনা প্লাস্টিকের কৌটা ব্যবহার করে নবজাতকদের অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

গত সোমবার দুপুরে শেবাচিম হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। একেকটি বেডে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে দুই থেকে চারজন শিশুকে। যাদের বেড জোটেনি, তাদের ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের ওয়ার্ডের স্যাঁতসেঁতে মেঝে কিংবা বারান্দা ফ্লোরে। সম্প্রতি হাম, নিউমোনিয়া ও ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শেষ একদিনে শুধু হাম আক্রান্ত শিশুই ভর্তি হয়েছে ৪২ জন।

হাসপাতালে ভর্তি ফাইজার মা নাম প্রকাশ না করে জানান, তার সন্তানের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু সুবিধা না থাকায় প্লাস্টিকের কৌটায় অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মেয়েটাকে বাঁচাতে চাই, কিন্তু কীভাবে বাঁচবে জানি না।’ একই ওয়ার্ডে মেঝেতে চিকিৎসাধীন আবদুল্লাহর মা বলেন, ‘আমি ও আমার স্বামী দুজনই দিনমজুর। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এখানে আল্লাহ ও ডাক্তারদের ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

চিকিৎসকরা জানান, অক্সিজেন হুড নবজাতকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জাম। এ যন্ত্রটি শিশুর শরীরের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে। হাসপাতালে অক্সিজেন হুড না থাকায় বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক কৌটা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নিরাপদ বলা যায় না।

শিশু বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, ‘শিশু ওয়ার্ডে শয্যা ৪০টি হলেও প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৪০ শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।  একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক রোগী দেখতে হচ্ছে। ফলে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট তো রয়েছেই। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, সে অনুযায়ী চিকিৎসক ও সরঞ্জাম বাড়েনি। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বলতে হয়, হাসপাতালটি আল্লাহর ওপর ভরসা করে চলছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবাই অভিযোগ করেন, কিন্তু জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না।’

 

Read more — স্বাস্থ্য
Home