উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অতিরিক্ত লবণ খাওয়ায় দেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু

উত্তরা ডেস্ক ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৩৩ অপরাহ্ণ
অতিরিক্ত লবণ খাওয়ায় দেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু

বাংলাদেশে ‘অতিরিক্ত লবণ খাওয়া’ বর্তমানে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ নেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

 

বুধবার (১৩ মে) বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষ্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বক্তারা।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব। তিনি বলেন, অতিরিক্ত লবণ নেওয়া বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। উচ্চমাত্রায় লবণ নেওয়া রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি আরও বলেন, লবণ খাওয়া কমাতে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

 

সেমিনারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্টেন্ট সাইন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ অকালে মারা যান। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যান্সারের মত নানা জীবনঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অতিরিক্ত লবণ নেওয়া উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালু করা খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ (এনসিডিএস) মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কৌশল এবং অতিরিক্ত লবণ নেওয়া কমানোর জন্য ‘ডব্লিওএইচও’ সুপারিশকৃত একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ। প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য দিয়ে এফওপিএল ভোক্তাদেরকে আরও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন করতে সহায়তা করবে এবং খাদ্য শিল্পকে পণ্যের পুষ্টিগুণ উন্নত করার জন্য সংস্কার করতে উৎসাহিত করবে। এটি বিদ্যমান জাতীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একটি সহায়ক খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যা জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে ভূমিকা রাখবে।

 

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে থাকা “লুকায়িত লবণ” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ, বিস্কুটসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাদ্যে উচ্চমাত্রার লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম বিদ্যমান, যা অধিকাংশ ভোক্তার অজানা। ফলে মানুষ না জেনেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ খেয়ে ফেলছেন। এজন্য উচ্চ লবণযুক্ত খাবার সহজে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং ব্যবস্থা চালু; প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রস্তুত প্রণালীর পুনর্গঠন; ও শিক্ষামূলক প্রচারণার মত কার্যকর কৌশলগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সুসংহত নীতিমালার মাধ্যমে স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মস্থলে কম লবণযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

 

প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফারুক আহম্মেদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ খাওয়া বর্তমানে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার মানুষের অজান্তেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যের মোড়কে সঠিক পুষ্টি তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

 

এমএম

Read more — স্বাস্থ্য
Home