
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। তবে ভোট যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কালো টাকা ও পেশিশক্তির শঙ্কা। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী ও রাজশাহী মহানগর শাখার নায়েবে আমীর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এই শঙ্কা প্রকাশের পাশাপাশি নির্বাচনে নারী ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রশাসনের ভূমিকা, গণমাধ্যমের দায়িত্ব এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক উত্তরা প্রতিদিন-এর প্রধান প্রতিবেদক আবু সাঈদ রনি।
উত্তরা প্রতিদিন : রাজশাহীতে বর্তমানে নির্বাচনী পরিবেশ কেমন দেখছেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে নির্বাচনী পরিবেশ মোটামুটি ভালো রয়েছে। আমরা আশা করছি উৎসবমুখর পরিবেশেই জনগণ ভোট দেবে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটি জায়গায় নারী ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং বাধা দেওয়ার কিছু ঘটনা ঘটেছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই আমরা মনে করি। আমরা আশা করব অন্যান্য দলের প্রার্থীরা তাদের কর্মীদের এ ধরনের কাজে নিরুৎসাহিত করবেন এবং সবাই মিলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে নির্বাচনী আচরণবিধি পুরোপুরি মেনে চলবেন।
উত্তরা প্রতিদিন : নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কি নিশ্চিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : এখন পর্যন্ত আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মোটামুটি দেখতে পাচ্ছি। তবে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা এবং প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরা প্রতিদিন : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : বর্তমানে রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। তবে আমরা মনে করি সন্ত্রাসী, দাগী আসামি এবং অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে নির্বাচনের সময় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রশাসন এ বিষয়ে সক্রিয় আছে এবং বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে, যা আমাদের নজরে এসেছে।
উত্তরা প্রতিদিন : গণভোট ও নির্বাচন একই দিনে করার সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : আমাদের অবস্থান ছিল গণভোট ও নির্বাচন একই দিনে না করা। বরং গণভোটটি আগে হলে ভালো হতো। কারণ গণভোটের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো নির্ধারিত হতো, তার ভিত্তিতেই নির্বাচন হতে পারত। একই দিনে দুটি প্রক্রিয়া চললে প্রান্তিক বা স্বল্পশিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। অনেকেই হয়তো একটি ব্যালটে ভোট দিয়ে অন্যটি বাদ দিয়ে চলে আসবেন, ফলে অনেক ভোট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমরা জনগণকে সচেতন করার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি।
উত্তরা প্রতিদিন : আগামী নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা এবং পেশিশক্তি ও কালো টাকার প্রভাব রোধ করা। বিশেষ করে নির্বাচনের শেষ দিকে কালো টাকা দিয়ে প্রান্তিক ভোটারদের ভোট কেনার চেষ্টা হতে পারে-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
উত্তরা প্রতিদিন : নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকল প্রার্থীকে সমান সুযোগ ও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালানো এবং সঠিক ও নিরপেক্ষ রিপোর্ট তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে জনগণ সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
উত্তরা প্রতিদিন : নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী? জয়-পরাজয়কে কিভাবে গ্রহণ করবেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : আমরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং সর্বত্র ব্যাপক সাড়া ও জনসমর্থন লক্ষ্য করছি। জনগণ বলছে, তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলকে সুযোগ দিয়েছে। এবার তারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পরিবর্তন ও জনকল্যাণমূলক কাজ দেখার জন্য একবার সুযোগ দিতে চায়। তাই আমি নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। তবে আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমরা তা মেনে নেব।
উত্তরা প্রতিদিন : নির্বাচনে বিজয়ী হলে কোন বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেবেন?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : প্রথম অগ্রাধিকার হবে রাজশাহীকে মাদকমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত করা। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বেশি। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি বন্ধ করাও আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
উত্তরা প্রতিদিন : দীর্ঘমেয়াদে রাজশাহীর উন্নয়নে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর : দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক মানের একটি ক্রিকেট ভেন্যু নির্মাণ আমাদের পরিকল্পনার অংশ। এছাড়া নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী-বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও শিশুদের পুনর্বাসন ও উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনাও রয়েছে।

