
রাজশাহীতে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। তবে বিষয়টি এখানেই থেমে নেই। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের কারণে বাড়ছে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের ঘটনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর হার ৭ দশমিক ১২ শতাংশ।
২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৬৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে এ হার ৫০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫৬ শতাংশ। একই জরিপে দেখা যায়, ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হচ্ছে ১৩ শতাংশ শিশুর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজশাহীর ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের স্থানীয় কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চললেও জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি এবং ছোটখাটো সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রকল্প ও অর্থায়ন কমে যাওয়াকেও বাল্যবিয়ের প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চলে বাল্যবিয়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চর মাঝারদিয়ায় একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পরই মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেক অভিভাবক মেয়েকে বিয়ে দেওয়াকেই নিরাপদ মনে করেন।
চর নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এমদাদুল হক বলেন, ‘অভিভাবকরাই তাদের সন্তানদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন। কারণ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে এসএসসি লেভেলের স্কুল বা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থাকা দরকার। এখানে কিন্তু সেগুলো নেই।’
চরের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কন্যাশিশু। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহী হলেও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরই বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে শিক্ষা, শৈশব ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারাচ্ছে।
নগর ও উপজেলা পর্যায়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও প্রচারাভিযান থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এসব কার্যক্রমের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বিশেষ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রকল্প ও অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সচেতনতামূলক কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে।
রাজশাহী ইইউডিএসের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক তাসবীর আহমদ খান বলেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্পের একটা কম্পোনেন্টের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হতো। মূলত ওই প্রকল্পগুলো বিশেষ করে ২০১৯ এবং ২০২২ সালের পরে কিছুটা কমে গেছে। ডোনার ফান্ডিংও কমে গেছে। সেই প্রকল্পগুলো এখন আর বাস্তবায়িত হয় না। তাই আমাদের উঠান বৈঠকও কমে গেছে।’
ধীরে ধীরে কর্মসূচিগুলো খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রাজশাহী লফসের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর রুট লেভেলে যাওয়া কঠিন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে ছোট সংগঠনগুলোকে নিয়ে তৃণমূলে যায়। ওই ফান্ডিংগুলো কমে যাওয়ার কারণেই আমাদের এ ইফেক্টটা পড়ছে।’
উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পালের ভাষ্য, ‘আর্থিক সংস্থান না থাকায় অনেকগুলো এনজিও বন্ধ হয়ে গেছে। যারা ছিল তারাও সীমিত হয়ে আসছে। যারা সীমিত হয়ে আসছে তারা হয়তো এই ইস্যুটা (বাল্যবিয়ে) বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছে।’
স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বিভিন্ন কমিটি থাকলেও সেগুলোর কার্যক্রম অনেক জায়গায় দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির পরিচালক ও বিভাগীয় জয়িতা রহিমা বেগম বলেন, ‘কমিটি আছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটি। তবে কমিটিগুলো সক্রিয় নেই। অনেক চেষ্টা করেছি আমরা সক্রিয় করার জন্য। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব থেকে চৌকিদার, চেয়ারম্যান-মেম্বার নিয়ে আমরা মিটিং করে এসেছি। তারপরও বোঝাতে পারি না।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগে গ্রাম পর্যায়ের কমিটিগুলো তুলনামূলক সক্রিয় ছিল। তারা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নিয়মিতভাবে কাজ করতেন। ফলে বাল্যবিয়ের ঘটনাও কিছুটা কম ছিল। বর্তমানে সেই তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারাও বলছেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা বাজেট না থাকায় কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
হুজুরিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন উঠান বৈঠক এবং আমরা পরিষদের আগে যেমন লোকজনকে ডাকা হতো, এটির তো একটি খরচ আছে। সেগুলো তো আমাদের বাজেটে নেই। এগুলো যতটুকু আমরা নিজের অর্থায়নে যতটুকু পারি, এতটুকু করি। তাছাড়া আমরা একটু কঠিন সমস্যার মধ্যেই আছি।’
দর্শনপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী বলেন, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা তৈরির জন্য কোনো বাজেট নেই। তবে আমরা আমাদের জায়গা থেকে যতদূর পারি চেষ্টা করি, যাতে এলাকায় বাল্যবিয়ে না হয়। আমাদের ইউএনওর নির্দেশ আছে—কোথাও বাল্যবিয়ে হলে তড়িঘড়ি গিয়ে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা।’
অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের পাশাপাশি এসব বিয়ের পর দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের ঘটনাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা। আইনজীবীদের মতে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি, কন্যাশিশুর শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতনতা, ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে চরাঞ্চলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো না গেলে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
ব্লাস্ট রাজশাহীর সমন্বয়ক আইনজীবী সামিনা বেগম বলেন, ‘পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের ক্ষেত্রে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমি দেখছি, বাল্যবিয়ে ও ডিভোর্সের সংখ্যাটা অনেক বেশি। মানে ভাবিয়ে তোলার মতো একটা সংখ্যা বর্তমান সময়ে।’
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও কাজ করছে। বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় ৮২টি ক্লাব-কমিটি ও ৫০টি হাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উন্নয়নকর্মীদের মতে, নামমাত্র ক্লাব বা বিচ্ছিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ।
পরিবর্তন উন্নয়ন বিশ্লেষক রাশেদ রিপন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি যদি মনে করেন তিনি তার কমিউনিটিতে কোনো বাল্যবিয়ে দেবেন না, এটি সম্ভব। আসলে আইন করে এটি কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাবে না, যদি না আমাদের সামাজিক আন্দোলন এবং মানুষের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা না থাকে।’
এ বিষয়ে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মো. কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাল্যবিয়ে ঠেকাতে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। গ্রামীণ পরিবারগুলোকে সচেতন করতে বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এ কার্যক্রমে কিছুটা তৎপরতা কমেছে।’

