
অবকাঠামো উন্নয়ন, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নগর পরিকল্পনার আধুনিক বাস্তবায়নে রাজশাহী আজ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় নগরী। ১২ লাখের বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ৯৭ বর্গকিলোমিটারের এই শহরটি এখন বহুতল ভবনের নগরে রূপ নিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে গত এক যুগে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ রাজশাহীর অবয়বে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। প্রশস্ত সড়ক, সড়কবাতির আলোকায়ন, সবুজ বেষ্টনী, নদীঘেঁষা সৌন্দর্যসহ অনুকূল বাসযোগ্যতার কারণে শহরে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহও বেড়েছে নাগরিকদের।
তবে একই সঙ্গে আবাসন খাতে তৈরি হয়েছে জটিলতা, প্রতারণা এবং বিনিয়োগ সংকট। নির্মাণসামগ্রীর দাম, জমির মূল্য, ব্যাংকের ঋণ–অসহযোগিতা এবং ‘শেয়ার ব্যবসা’–নামক অনিয়ন্ত্রিত নতুন প্রবণতা পুরো আবাসন খাতকে এক অনিশ্চিত পরিবেশে নিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ডেভেলপাররা, বিনিয়োগকারীরা এবং স্বপ্নের ফ্ল্যাটের মালিক হতে চাওয়া সাধারণ ক্রেতারা। ফলে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহীতে সংগঠিতভাবে আবাসন ব্যবসার যাত্রা শুরু হয় ২০১১–১২ সালের দিকে। শুরুতে হাতে গোনা ১৭–১৮ জন ডেভেলপার এ খাতে কাজ শুরু করেন। গ্রাহকদের প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দিতে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহীর আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (রেডা)। সদস্যদের মাধ্যমে পরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হয়। পরবর্তীতে রেডার সদস্যরা রাজশাহীর নগর সৌন্দর্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর রাজস্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
কিন্তু খাতটি যখন সম্ভাবনার সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়, তখন শুরু হয় নতুন ধরনের প্রতারণা—‘শেয়ার ব্যবসা’। এতে গত কয়েক বছরে আবাসন খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জানা যায়, আবাসন ব্যবসার প্রচলিত নিয়ম হলো—ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করবে। কিন্তু রাজশাহীতে কিছু গোষ্ঠী, বিশেষ করে কিছু সরকারি চাকরিজীবী নিজেদের পরিচয়ে বা ছদ্মবেশে আবাসন খাতে ঢুকে নতুন একটি অবৈধ মডেল দাঁড় করিয়েছেন—‘শেয়ার বিজনেস’।
এই প্রক্রিয়ায় কয়েকজন ব্যক্তি মিলে ১০–১৫ কাঠা জমি বায়নামা করে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ‘শেয়ার’ হিসেবে ৫০–৬০ জনের কাছে বিক্রি করছেন। এতে কথার জালে ফাঁসিয়ে শেয়ার মূল্য বেশি বেশি ধরে জমি ক্রয়ের দুই বা তিন গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন পর নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান ওই অসৎ ব্যবসায়ীরা। পরবর্তীতে একই প্রকল্পে যে ৫০–৬০ জন বিনিয়োগ করেন, তারা কেউ কাউকে চেনেন না। ফলে- প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়া, নির্মাণ থমকে যাওয়া, ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হওয়াসহ নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। রাজশাহীতে এমন প্রায় ৪৮টি গ্রুপ শেয়ার ব্যবসার নামে প্রতারণায় লিপ্ত রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তারা অভিযোগ করে বলেন, কিছু অসাধু গোষ্ঠী শেয়ার বিক্রির পাশাপাশি আইনবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণও করছেন। ৯ তলার প্ল্যানের জায়গায় ১১–১২ তলা পরিকল্পনা, ১০ কাঠা জমিতে ২০ তলা ভবনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা—এসব এখন নিয়মিত ঘটনা। সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। প্রতারকরা শুধু ক্রেতাদের নয়, নির্মাণশ্রমিকদের সঙ্গেও প্রতারণা করছেন। শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে দিয়ে কমিশন নেওয়া, টাইলস, রড, সিমেন্টসহ নানা নির্মাণসামগ্রীর ক্রয়ে কমিশন নেওয়া হচ্ছে। এতে ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, অথচ নির্মাণমান মানদণ্ডে থাকছে না।
জানা যায়, যে ডেভেলপাররা নিয়ম মেনে কাজ করেন, তাদের— সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়, রেডা ও চেম্বারের সদস্য হতে হয়, আরডিএ–র নিয়ম মেনে জমি ও নির্মাণ অনুমোদন নিতে হয়। অথচ শেয়ার ব্যবসায়ীদের কিছুই করতে হয় না। তাদের না আছে অফিস, না আছে ট্রেড লাইসেন্স, না কোনো জবাবদিহি। ফলে প্রকৃত ডেভেলপাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব এবং সাধারণ ক্রেতারা পড়ছেন ঝুঁকির মুখে। কেননা, একটি ফ্ল্যাট নিবন্ধনে সরকার প্রায় ৩–৪ লাখ টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ভবন নির্মাণে সরকারের রাজস্ব আদায় শূন্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীতে ১,২০০–১,৬০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট সবচেয়ে বেশি নির্মিত হয়। যা আগে ৪০–৬০ লাখ টাকায় ভালো মানের ফ্ল্যাট কেনা যেত। বর্তমানে তা ৭০–৮০ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রীর দাম দ্বিগুণ, ডলারের দাম বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের কঠোর ঋণনীতি, সর্বোপরি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।
রেডা জানিয়েছে, শুধু ২০২২ সালের শেষ দিকেই নির্মাণসামগ্রীর দাম এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ হয়। ব্যবসায় ধস নামে। ব্যাংক ঋণও কার্যত বন্ধ। ফলে বিনিয়োগ থমকে গেছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, রাজশাহীতে ফ্ল্যাট কেনেন মূলত—ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি কর্মকর্তা ও প্রবাসীর পরিবার। তাদের লক্ষ্য একটি ছোট, নিরাপদ, আধুনিক আবাসন।
রেডার সাধারণ সম্পাদক ও আল-আকসা প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান কাজী বলেন, রাজশাহীর মানুষ সীমিত আয়ের মধ্যেই ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বর্তমান দামের কারণে ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ফলে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
রেডার সভাপতি তৌফিকুর রহমান লাভলু বলেন, বর্তমান অস্থির জাতীয় পরিবেশ রিয়েল স্টেট ব্যবসাকে প্রভাবিত করেছে। নির্বাচিত সরকার না থাকায় মানুষ বড় বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। ফলে বিক্রি কমেছে। তবে নির্বাচিত সরকার এলে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করি। কিন্তু তার আগে, আবাসন খাত টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলো হলো-শেয়ার ব্যবসা অবিলম্বে বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা, ডেভেলপারদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ও অফিস বাধ্যতামূলক, ব্যাংক ঋণ ডেভেলপার–বান্ধব করতে নীতিমালা সংস্কার, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ বন্ধে তদারকি বৃদ্ধি করা। কেননা, অনিয়ন্ত্রিত শেয়ার ব্যবসা, নীতিমালার জটিলতা ও বাজারের অস্থিরতা পুরো খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

