
উত্তরা প্রতিবেদক:
ফসলি জমিতে নতুন করে পুকুর খনন করে মাছ চাষ বন্ধের আহবান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। গতকাল শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে মৎস্য অনুষদ আয়োজিত দিনবাপী মৎস্য বিষয়ক সামিট ও এক্সপো অনুষ্ঠানে তিনি এ আহবান জানান।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ - যেখানে ধান চাষ হয়, যেখানে খাদ্য উৎপাদন হয়, অন্য কৃষি ফসল উৎপাদন হয়, সেখানে মাছ চাষ না করে যেখানে ওগুলো এখন করা যাচ্ছে না সেখানে আমরা যেন মাছ চাষ করি।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহীসহ আশে-পাশের জেলাগুলোতে গত দুই দশক ধরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য কৃষি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন চলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় গত এক দশকে পুকুরের সংখ্যা ২০১৫ সালে ৪০,৭৮৮ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫১,২৭৫ এ পৌঁছেছে। তবে জেলা মৎস্য অফিসের খাতা-কলমে ১১ হাজার পুকুর বাড়ানোর হিসাব থাকলেও বাস্তবে তা কয়েক গুণ বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস উপদেষ্টা বলেন, ময়মনসিংহে বেশি মাছ চাষ হলেও রাজশাহীর অবদানও কম নয়। রাজশাহী থেকে সারাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে।
মাছ চাষে অনিরাপদ ফিড ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুকি বাড়ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আপনারা যদি নিরাপদ ফিড না ব্যবহার করেন, তাহলে আপনারা যে মাছটা চাষ করবেন সেটিও অনিরাপদ হয়ে যাবে। পরে সেটি মানুষ খাবে। তাদের স্বাস্থ্যের জন্য একটা ঝুকি তৈরি। সে কারণে আমরা চাই না কোনো অবস্থাতেই অনিরাপদ ফিড বাজারে আসুক। এজন্য যারা ফিড উৎপাদন করে তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং এখানে নজরদারিও বাড়াতে হবে। এছাড়াও অনেকগু ওষুধ মাছে দিতে হয় সেটা সেটাও নিরাপদ কিনা নিশ্চিত হতে হবে।
ফরিদা আখতার বলেন, বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন দুভাবে হয়ে থাকে। একদিকে নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় থেকে অপরদিকে মৎস্য চাষের মাধ্যমে। দুটো পদ্ধতিই গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য চাষ নিজের গুণেই এগিয়ে যাচ্ছে। অ্যাকুয়াকালচার মাধ্যমে মৎস্য চাষের কারণে বাজারে মাছের সরবরাহ বেড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী দামে মাছ খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, আমরা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছ ধরব না, খাব না।
তিনি বলেন, মাছ রপ্তানি হতেই হবে। যেসব দেশে মাছ রপ্তানি করবেন, সেসব দেশেও বাঙালি আছে। আপনার এই মাছটি তারাই খাবে। প্রবাসীরা কষ্ট করে আমাদের রেমিট্যান্স পাঠায় অথচ তারা যদি মাছ না পায় সেটা দুঃখজনক ব্যাপার। আমি মনে করি, আমাদের রপ্তানির সুযোগ অবশ্যই তৈরি করতে হবে। এ সময় তিনি কার্পজাতীয় মাছের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মাছ উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ সম্মেলনেও সারাবিশ্বে মাছ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, বিশেষ করে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পুকুরের মাছগুলো বেশি তাপ সহ্য করতে না পেরে মারা যাচ্ছে। তাই সেটার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা শিখতে হবে এবং মাছকে বাঁচার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
ফরিদা আখতার বলেন, মৎস্যচাষ নীতি প্রণয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। এটা হলে চাষি হিসেবে করণীয় বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে। এ নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সহজ হবে। এ সময় তিনি ইলিশ রক্ষা এবং কৃষিজমিতে পুকুর খনন না করে, অনাবাদি জমিতে পুকুর খনন করে মৎস্যচাষের জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের ডিন ও সামিট আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান মণ্ডলের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. মো. আক্তার হোসেন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ। অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। এ সময় রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মৎসচাষি এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

