
রাজশাহীর পুঠিয়ায় ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য মিনি স্টেডিয়ামের কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি। ফলে উদ্বোধনের আগেই স্টেডিয়ামের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ধীরগতির পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে এমন হয়েছে অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী ও ক্রীড়ামোদিদের মধ্যে তীব্র হতাশা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, দর্শক গ্যালারির বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। বসার চেয়ারগুলো নড়বড়ে, নতুন লাগানো বৈদ্যুতিক লাইট খুলে পড়ছে। কিছু স্থানে টাইলস উঠে গেছে, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। এমনকি মাঠের বড় অংশ এখনো খেলার উপযোগী করে তৈরি হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও স্টেডিয়ামের মূল মাঠ, গ্যালারি, আলো ও স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।
ই-ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন পরিষদ এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীনে প্রকল্পটির কাজ করছে। কিন্তু নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার ও তদারকির ঘাটতির কারণে পুরো প্রকল্পটি এখন সমালোচনার মুখে পড়েছে।
পুঠিয়া উপজেলার স্থানীয় ক্রীড়ামোদিরা অভিযোগ করে বলেন, নতুন স্টেডিয়ামে খেলাধুলা শুরু করার আগে এমন ত্রুটি দেখা দেওয়া দুঃখজনক। তারা মনে করেন, যথাযথ তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করছে।
স্থানীয় সাবেক ক্রিকেটার নিপু রহমান বলেন, “আমার বাড়ি স্টেডিয়ামের পাশে। প্রতিদিন দেখি কে কীভাবে কাজ করছে। কোনো তদারকি নেই, গুণগত মানের কোনো হিসাব নেই। এখন থেকেই ভাঙাচোরা অবস্থা, ভবিষ্যতে কী হবে চিন্তা করে ভয় লাগে।”
উপজেলা ক্রীড়া সদস্য রিকো মণ্ডল বলেন, “যে মানের রড এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বড় কোনো স্থাপনার জন্য উপযুক্ত নয়। ইউএনও স্যার নিজে এসে কাজের ত্রুটি দেখেছেন ও ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন। তারপর কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
অন্যদিকে, উপজেলা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ও বর্তমান উপজেলা ছাত্র প্রতিনিধি শাফিন আক্তার বলেন, “আমরা নিজের চোখে দেখেছি গ্যালারিতে ফাটল, টাইলস উঁচু-নিচু। উদ্বোধনের আগেই এই অবস্থা—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
জানা যায়, গত আগস্ট মাসে স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পাবনা-নাটোর জেলার সঙ্গে একযোগে পুঠিয়া মিনি স্টেডিয়াম উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু স্টেডিয়ামটির কাজ শেষ না হওয়ায় উদ্বোধন অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়।
ক্রীড়ামোদিদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবল খেলোয়াড়রা জানান, নতুন স্টেডিয়ামে অনুশীলনের আশায় তারা অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু ধীরগতির কাজ ও নিম্নমানের নির্মাণের কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, “প্রকল্পের তদারকি নিয়মিত হলে এই ধরনের ফাটল বা নিম্নমানের অভিযোগ ওঠার কথা নয়। কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরীক্ষণ দরকার ছিল।”
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রকৌশলী মারুফ হোসেন বলেন, “আমাদের মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ। এখনো মাঠ সংস্কার ও কিছু ছোট কাজ বাকি আছে। সব কাজ শেষ হওয়ার পর পুরো প্রকল্পের মান নিশ্চিত করা হবে।”
একইভাবে, প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রাসেল হোসেন দাবি করেন, “আমাদের কাজের গুণগতমান ঠিক আছে। যেসব স্থানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো এখনো চূড়ান্ত কাজ নয়। পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগে যেকোনো ত্রুটি আমরা ঠিক করে দেব।”
পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লিয়াকত সালমান বলেন, “যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, আমি ঠিকাদারকে তা ঠিক করার নির্দেশ দেব। আপনাদের মাধ্যমেও যদি কোনো সমস্যা জানতে পারি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “এটি পুঠিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আমরা চাই কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হোক, যাতে স্থানীয় ক্রীড়ামোদিরা একটি সুন্দর মাঠ পান।”

