উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর রাজশাহীর বইমেলা প্রাঙ্গণ

উত্তরা প্রতিদিন ইয়াজ উদ্দীন আহম্মেদ ৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৬ অপরাহ্ণ
শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর রাজশাহীর বইমেলা প্রাঙ্গণ

দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়ে এসেছে। রাজশাহী মহানগরীর বিভাগীয় বইমেলা প্রাঙ্গণের চারপাশে কচিকাঁচাদের কোলাহলে জমে উঠেছে এক উৎসবের আমেজ। কারও হাতে বাবার ধরা আঙুল, কারও কাঁধে স্কুলব্যাগ ঝুলে আছে, কেউ আবার বন্ধুর হাত ধরে ছুটে যাচ্ছে স্টলের দিকে। বইমেলার বাতাসে আজ ভেসে বেড়াচ্ছে কাগজের গন্ধ, মুদ্রিত অক্ষরের সৌরভ আর নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সার্বিক সহযোগিতায় গত ৩১ অক্টোর নভেম্বর থেকে রাজশাহীতে শুরু হওয়া নয় দিনব্যাপী বিভাগীয় বইমেলায় প্রতি বিকেলেই যেন বইয়ের উৎসবের পাশাপাশি শিশুর হাসির উৎসবও বসে। “একটা ভালো বই জীবনের সঙ্গী হতে পারে”—এই উপলব্ধি হয়তো তাদের অজানাই, তবুও রঙিন প্রচ্ছদে সাজানো বইয়ের তাক তাদের চোখে আলাদা এক আলো জ্বেলে দেয়।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের আয়োজনে সার্কিট হাউজের পেছনের কালেক্টরেট মাঠে বসা এবারের বিভাগীয় বইমেলা শনিবার শেষ হয়েছে। মেলায় এবার অংশ নেয় ৮১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ১১টি, আর বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থা ৭০টি। এ মেলার প্রবেশমুখ থেকেই চোখে পড়ে রঙিন সাজে সাজানো শিশুদের বইয়ের স্টল। ছোটদের গল্প, ছড়া, উপন্যাস, রূপকথা, রহস্যময় থ্রিলার—সব ধরনের বইয়ে ভরে ছিল তাকগুলো। শিশুদের জন্য ছিল বিশেষ শিশু কর্নার, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও গল্প বলার আয়োজন।

স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ছুটে আসে বইমেলায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ শিক্ষকের নেতৃত্বে, আবার কেউ বাবা-মায়ের হাত ধরে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই ছোট্ট পাঠকদের ভিড়। বই ঘেঁটে দেখা, পছন্দের লেখকের নতুন বই খোঁজা, স্টল ঘুরে ঘুরে রঙিন প্রচ্ছদ দেখা—সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয় বইয়ের প্রতি ভালোবাসা।

সরেজমিনে মেলায় দেখা যায়, এক শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টল থেকে স্টল ঘুরছেন। কখনো বলছেন কোন বইটি বয়স উপযোগী, কখনো আবার বোঝাচ্ছেন পড়ার গুরুত্ব। একটু দূরেই একদল কিশোরী গল্পে মগ্ন, আরেকদল নতুন বই হাতে সেলফি তুলছে। বইমেলা যেন তাদের কাছে শুধু সাহিত্য নয়, আনন্দ আর উৎসবের আরেক নাম।

পিএন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার প্রথমবারের মতো এসেছে বইমেলায়। তাঁর চোখেমুখে উচ্ছ্বাস, হাতে বইয়ের ব্যাগ। সে জানাল, “আমি প্রথমবার বইমেলায় এলাম। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। আমি ভূতের ট্রেন আর ভূতের গল্প—এই দুইটা বই কিনেছি। ছোটরা বই কিনে অনেক কিছু শিখতে পারে, জ্ঞান বাড়ে।”

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাসুমা আনতারা জানাল, বইমেলায় আসা তার জন্য এক আনন্দের অপেক্ষা। “সারা বছর ধরেই বইমেলার জন্য অপেক্ষা করি। এবার বছরের শেষে আবার একটা বইমেলা হচ্ছে, তাই খুব ভালো লাগছে। আমি সবগুলো স্টল ঘুরে আটটা বই কিনেছি—সবগুলোই থ্রিলার আর রহস্যধর্মী।”

বিক্রেতাদের কাছেও বইমেলার এই তরুণ পাঠকরা যেন নতুন আশার আলো। ৩২ নম্বর স্টলে বিক্রেতা জুবায়ের, যিনি রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী, বললেন, “স্কুলের শিক্ষার্থীরা দুপুরে বেশি আসে। কেউ নির্দিষ্ট বইয়ের খোঁজে আসে, কেউ নতুন লেখকের বই দেখতে। না পেলেও তারা ঘুরে ঘুরে বই দেখে, ছবি তোলে—এটাই ভালো লাগছে।”

৪১ নম্বর স্টলের বিক্রেতা ইতি জানান, “বিকেলে স্কুলের শিক্ষার্থীরা আসে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে, আর ছোট বাচ্চারা বাবা-মার সঙ্গে সন্ধ্যার পর আসে। তারা ছোটগল্প, রহস্যময়, থ্রিলার ধরনের বই বেশি কিনছে। আমি প্রথমবার স্টল দিয়েছি, অভিজ্ঞতাটা খুব ভালো লাগছে। বই বিক্রি হচ্ছে, আমিও বই পড়ছি।”

বইমেলায় ছোটদের অংশগ্রহণের ফলে মেলায় এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা নামতেই দেখা যায় বাবা-মার হাত ধরে ছোট ছোট পাঠকেরা মেলায় ঢুকছে। তাদের মুখে হাসি, হাতে ক্যান্ডি, চোখে কৌতূহল। কেউ বইয়ের পাতা উল্টে দেখে, কেউ চিত্র বইয়ের রঙে হারিয়ে যায়। অনেকেই বই কেনার চেয়ে মেলা ঘুরতে বেশি আগ্রহী, তবে দু’একটা বই কিনে নিয়ে যেতে ভোলে না।

বিক্রেতারা বলছেন, শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ভূতের গল্প ও রূপকথা। কিশোরদের পছন্দ থ্রিলার, রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস। তবে শিক্ষকদের মতে, এই আগ্রহই ভবিষ্যতের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলে।

রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠা মানে তাদের চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বিকাশের সুযোগ দেওয়া। মেলা যদি তাদের সেই অনুপ্রেরণা দিতে পারে, সেটাই হবে আসল সাফল্য।”

তিনি আরও বলেন, বই কেবল তথ্য বা বিনোদনের উৎস নয়, বরং মানুষ ও সংস্কৃতিকে জানার এক অনন্য মাধ্যম। বই শেখায় সময়ের মূল্য, বাড়ায় লেখার আগ্রহ, আর খুলে দেয় কল্পনার দুয়ার। তাই বইমেলা শুধু এক উৎসব নয়, এটি ভবিষ্যতের পাঠক তৈরির এক উর্বর ক্ষেত্র। রাজশাহীর এই বইমেলাও সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। এখানে বই কিনছে শিশুরা, আলোচনা করছে কিশোররা, আর প্রাপ্তবয়স্করা দেখছেন—একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে বইয়ের ঘ্রাণে বড় হয়ে উঠছে। বইমেলার এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, ডিজিটাল যুগে স্ক্রিনের আলো যতই ঝলমলে হোক, ছাপার অক্ষরের টান কিন্তু এখনও কমে যায়নি। বরং সেই টানেই রাজশাহীর বইমেলায় প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছে ছোট্ট পাঠকরা—যাদের হাতে ধরা বইয়ের পাতায়ই লেখা হচ্ছে আগামী দিনের গল্প।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home