উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

আপিলেও মিলতে পারে কাঙ্ক্ষিত তথ্য: প্রসঙ্গ তথ্য অধিকার আইন

মোঃ তৌহিদুজ্জামান ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৮ অপরাহ্ণ
আপিলেও মিলতে পারে কাঙ্ক্ষিত তথ্য: প্রসঙ্গ তথ্য অধিকার আইন
মোঃ তৌহিদুজ্জামান

তথ্য অধিকারের আলোচনায় আমাদের দেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তথা সুশাসনের প্রসঙ্গই বেশি উচ্চারিত হয়। এটা কিন্তু বিশ্বব্যাপী মৌলিক মানবাধিকার হিসেবেও স্বীকৃত। এই মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের তথ্য অধিকার আইনে (আরটিআই) বলা হয়েছে, এই আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কোনো নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে। আইনের ৪ ধারার এই বিধানমতে, দেশের সব সরকারি দপ্তর এবং সরকারি বা বিদেশি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত বা পরিচালিত সব বেসরকারি দপ্তরের কাছে নাগরিকের তথ্য চাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ হিসেবে ওই সব প্রতিষ্ঠান তথ্য দিতে বাধ্য।

তথ্য অধিকার আইন অনুসারে কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য নাগরিককে ওই দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর অনুরোধ বা আবেদন করতে হয়। তথ্য প্রাপ্তির জন্য এই অনুরোধ বা আবেদনই কিন্তু চূড়ান্ত পদক্ষেপ নয় বরং এটা হচ্ছে প্রাথমিক পদক্ষেপ। প্রাথমিক অনুরোধে তথ্য না পেলে আবেদনকারীর আরও দুই স্তরে তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ রাখা হয়েছে আইনটিতে, যার একটি আপিল ও অপরটি অভিযোগ। নিবন্ধের কলেবর ছোট রাখার স্বার্থে এ লেখায় ‘আপিল’ প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

অনেক সময় দেখা যায়, নাগরিক তথ্যের জন্য আবেদন করেছেন কিন্তু কর্তৃপক্ষ তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বা অপারগতার নোটিশ প্রেরণ করেছেন। তথ্য প্রদানে অপারগতার নোটিশ কিন্তু বিধিসম্মত। তবে কারণ উল্লেখ না করে তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না, এর পেছনে যুক্তি উল্লেখ করতে হয়। তথ্য কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে তথ্যের জন্য যে ৮ হাজার ৭৪৭ টি আবেদন পড়েছে তার মধ্যে ৭৭১টি আবেদনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তথ্য না দেওয়ার বা অপারগতার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে তথ্য না দেওয়ার যে কারণগুলো দেখানো হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক নয় এমন তথ্য চাওয়া, প্রদানযোগ্য কোনো তথ্য না হওয়া, তথ্যের মূল্য পরিশোধ না করা, সংশ্লিষ্ট শাখায় তথ্য না থাকা, যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন না করা এবং যাচিত তথ্য সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট না হওয়া।

তথ্য সরবরাহে অপারগতার নোটিশ পেলে আবেদনকারী যদি মনে করেন, অপারগতার নোটিশে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা যথার্থ নয়, তাহলে তিনি আপিল করতে পারবেন। শুধু অপারগতার নোটিশের ক্ষেত্রেই আপিল করা যায় তা নয়, তথ্য পাওয়ার পরও আপিলের সুযোগ থাকে। নাগারিক যদি দেখেন, যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা আংশিক, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর, তবে তিনি আপিল করতে পারবেন। আবার, তথ্য প্রদানের জন্য আইনে যে নির্ধারিত সময়সীমা দেওয়া আছে, সেই সময়সীমার মধ্যে যদি তথ্য দেওয়া না হয় অথবা তথ্য দেওয়া হবে না, এটাও যদি সময়ের মধ্যে না জানানো হয় তাহলেও আপিল করা যায়।

আপিল করতে হয় আপিল কর্তৃপক্ষ বরাবর। মনে রাখতে হবে, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা এবং আপিল কর্তৃপক্ষ একই ব্যক্তি নয়। আইন অনুসারে, আপিল কর্তৃপক্ষ হচ্ছে তথ্য প্রদানকারী ইউনিটের অব্যবহিত উপরের অফিসের অফিস প্রধান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে তথ্যের জন্য আবেদন করলে ওই আবেদনের বিষয়ে আপিল করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক হবেন আপিল কর্তৃপক্ষ। একইভাবে কোনো জেলা কার্যালয়ে তথ্যের আবেদন করলে উক্ত কার্যালয়ের আঞ্চলিক বা বিভাগীয় প্রধান হবেন আপিল কর্তৃপক্ষ। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো অফিসের সরাসরি উপরে আর কোনো অফিস নেই, যেমন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কথা বলা যায়। এমন পরিস্থিতিতে ওই অফিসের প্রধান হবেন আপিল কর্তৃপক্ষ এবং তার নিচের একজন তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হবেন।

আপিলের জন্য সময় দেওয়া আছে ৩০দিন। আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য বা তথ্য প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত না পেলে, কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কোনো সিদ্ধান্তে সংক্ষুদ্ধ হলে উক্ত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার বা সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করতে হয়। তবে আপিল কর্তৃপক্ষকে যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট করা যায় যে, যুক্তিসংগত কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আপিল দায়ের করতে পারেননি, তাহলে তিনি সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও আপিল আবেদন গ্রহণ করতে পারেন।

তথ্য প্রাপ্তির আবেদনের মতো আপিলের জন্যও নির্ধারিত ফরম আছে, যার নাম ‘গ’ ফরম। এই ফরমে আপিল কর্তৃপক্ষের নাম ও পদবি, তার দপ্তরের নাম ও ঠিকানা, আপিলকারীর নাম ও ঠিকানা, আপিলের তারিখ, যদি কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয় তবে সেই আদেশের কপি, যার আদশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে তার নামসহ আদেশের বিবরণ, আপিলের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ, প্রার্থিত প্রতিকারের যুক্তি ইত্যাদি লিখে স্বাক্ষর করে জমা দিতে হবে। 

আপিল নিষ্পত্তি হয় ১৫ দিনের মধ্যে। আপিল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শুনানির জন্য ডাকতে পারবেন এবং পূর্বের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। আপিলকারীকে শুনানির জন্য ডাকলে কমপক্ষে ৩ দিন পূর্বে শুনানির তারিখ সম্পর্কে অবহিত করতে হয়। আপিলের সিদ্ধান্ত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত আপিল কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বা প্রদত্ত তথ্য সঠিক নয়, তবে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়ে আপিল নিষ্পত্তি করবেন। আর আইন অনুসারে তথ্য না দেওয়া বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য সঠিক মনে হলে তিনি উক্ত সিদ্ধান্ত বহাল রেখে আপিল নিষ্পত্তি করবেন।

আপিলে তথ্য প্রদানের সিদ্ধান্ত হলে সিদ্ধান্ত পাওয়ার তারিখ থেকে আইন অনুসারে তথ্য প্রদানের যে সময় নির্ধারণ করা আছে, তার মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য সরবরাহ করবেন। এমন সিদ্ধান্তের পরও যদি তথ্য পাওয়া না যায় বা আপিলের সিদ্ধান্তেও যদি নাগরিক সংক্ষুব্ধ থাকেন তাহলে তিনি তথ্য প্রাপ্তির সর্বশেষ পদক্ষেপ ‘তথ্য কমিশনে অভিযোগ’ করতে পারবেন।

আপিল বা অভিযোগ সব ক্ষেত্রেই পূর্বের পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে। আপিলের সময়, তথ্য প্রাপ্তির আবেদন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যে-সব সিদ্ধান্ত ছিল অর্থাৎ অপরাগতা নোটিশ হলে সেটা অথবা যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, তা অবশ্যই সংযুক্ত করতে হয়। অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তির আবেদন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যে-সব সিদ্ধান্ত ছিল এবং আপিলের আবেদন ও যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা অবশ্যই যুক্ত করতে হবে। এসব প্রমাণক ছাড়া আপিল বা অভিযোগ করলে সে আবেদন শুনানির জন্য বিবেচিত হবেনা। মনে রাখতে হবে, শুধু সঠিকভাবে আপিল করলেই মিলতে পারে কাঙ্ক্ষিত তথ্য।

মোঃ তৌহিদুজ্জামান

উপপ্রধান তথ্য অফিসার

আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী

 

Read more — মতামত
Home