উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

দিনের শুরু কি অন্ধকারে, আলোয় নাকি সন্ধ্যার সীমানায়?

উত্তরা ডেস্ক ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ণ
দিনের শুরু কি অন্ধকারে, আলোয় নাকি সন্ধ্যার সীমানায়?

রাত গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে থামে ১২টার ঘরে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা বলি, নতুন দিন শুরু। অথচ এই একই সময়ে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে কেউ হয়তো সূর্যাস্তের পরই নতুন দিন ধরে নিয়েছে। আবার কোথাও ভোরের প্রথম আলোই দিনের সূচনা। তাহলে দিনের শুরু আসলে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় মানবসভ্যতার ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জটিল এক সংযোগস্থলে। যেখানে ‘সময়’ কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক নির্মাণ।

অন্ধকারেই শুরু

আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুরু হয় রাত ১২টা থেকে।

তবে এই ধারণা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রাচীন রোমান সভ্যতাতে দিন গণনার একাধিক পদ্ধতি ছিল।কখনো সূর্যোদয় থেকে, কখনও মধ্যাহ্ন থেকে, আবার কখনও মধ্যরাত থেকেও। অর্থাৎ, দিন কোথা থেকে শুরু এ নিয়ে তখনও একক কোনো মানদণ্ড ছিলনা। মধ্যরাতকে দিন শুরুর মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় অনেক পরে, বিশেষ করে যান্ত্রিক ঘড়ির উন্নয়ন এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা বৃদ্ধির পর। ১৬ শতকে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটি সংশোধন করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। যদিও তিনি মধ্যরাতকে নতুনভাবে নির্ধারণ করেননি, তার সংস্কার করা ক্যালেন্ডারই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং মধ্যরাতভিত্তিক দিন গণনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রশাসন, কম্পিউটার সিস্টেম ও বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য মধ্যরাত সবচেয়ে সুবিধাজনক। কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট, স্থির এবং সর্বজনীন বিভাজনরেখা তৈরি করে।

মধ্যরাত কেন? ঘড়ির কাঁটা থেকে বিশ্বমান

কেন রাত ১২টাকেই দিনের শুরু ধরা হলো, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ঘড়ির কাঁটায় নয়, লুকিয়ে আছে পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে চালানোর প্রয়োজনের ভেতরে। যখন পৃথিবী ছোট ছিল, অন্তত মানুষের চোখে, তখন সূর্যই ছিল সময়ের একমাত্র মাপকাঠি। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর হঠাৎই পৃথিবী ‘ছোট’ হয়ে গেল। ট্রেন ছুটতে শুরু করল এক শহর থেকে আরেক শহরে, টেলিগ্রাফ মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে দিল দূর দেশে। তখন দেখা গেল, এক জায়গার সময় আরেক জায়গার সঙ্গে মেলে না।

এই বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে ১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল মেরিডিয়ান কনফারেন্স। সেখানেই ঠিক করা হয়, পৃথিবীর সময় গণনার শূন্যবিন্দু হবে ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ। সেখান থেকেই জন্ম নেয় গ্রিনিচ মিন টাইম, একটি মান সময়, যার সঙ্গে মিলিয়ে পৃথিবীর সব সময় অঞ্চল (টাইম জোন) নির্ধারণ করা হয়। এই বৈশ্বিক মান নির্ধারণের পর দরকার হলো দিনের একটি অভিন্ন শুরু। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত এখানে কাজ করে না, কারণ সেগুলো স্থানভেদে বদলায়। তাই আবার ফিরে আসা হলো সেই নীরব মুহূর্তে, মধ্যরাত। রাত ১২টা এমন একটি সময়, যখন একটি দিন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন দিনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। আন্তর্জাতিক সময় গণনায় এটিই সবচেয়ে পরিষ্কার বিভাজনরেখা। আজ আমরা যখন রাত ১২টায় নতুন দিন শুরু করি, তখন সেটি শুধু একটি দেশের সিদ্ধান্ত নয়, এটি আসলে পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলানো এক সমঝোতা। গ্রিনিচের সেই কাল্পনিক রেখা থেকে শুরু হয়ে, সময় এখন ঘুরে বেড়ায় পুরো পৃথিবীজুড়ে। আর প্রতিটি মধ্যরাতে, নিঃশব্দে, একসঙ্গে শুরু হয় নতুন দিন।

আলো ফোটার সঙ্গে দিন

মানুষ যখন ঘড়ি বানায়নি, তখন সময় বোঝার একমাত্র উপায় ছিল প্রকৃতি। আর সেই প্রকৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন, সূর্যোদয়। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ এমন বহু সভ্যতায় দিনের সূচনা সূর্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। বিশেষ করে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা ও পঞ্জিকা ব্যবস্থায় সূর্যোদয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়চিহ্ন। হিন্দু পঞ্জিকায় একটি দিনের (তিথি) গণনা চন্দ্রচক্রভিত্তিক হলেও, বাস্তব দিন নির্ধারণে সূর্যোদয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা হিসেবে ধরা হয়। ধর্মীয় আচারে যেমন ‘ব্রাহ্মমুহূর্ত’ অর্থাৎ ভোরের আগে-পরে সময় দিনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সূর্যোদয়ের একটি বড় সমস্যা হলো, এটি স্থানভেদে ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কঠিন। এই অনিশ্চয়তার কারণেই আধুনিক বিশ্বে সূর্যোদয়-ভিত্তিক দিন গণনা প্রধান পদ্ধতি হিসেবে টিকে থাকেনি।

সূর্য ডোবার পরই নতুন দিন

মানবসভ্যতার আরেকটি বড় ধারা বলে, দিন শুরু হয় সূর্যাস্তে। ইসলামি ক্যালেন্ডার, অর্থাৎ হিজরি ক্যালেন্ডার-এ দিন শুরু হয় সূর্যাস্ত থেকে। মাগরিবের সময় নতুন দিন শুরু হয়, এবং তা পরবর্তী সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এই ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে চাঁদের গতির ওপর নির্ভরশীল। চাঁদের এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়, এই চক্রই মাস নির্ধারণ করে। ফলে ১২ মাসে মোট বছর হয় প্রায় ৩৫৪ দিন। ইসলামি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এই ধারণা স্পষ্ট। রমজান মাস শুরু হয় চাঁদ দেখার পরের সন্ধ্যা থেকেই। অর্থাৎ, ধর্মীয়ভাবে ‘দিন’ শুরু হয় আগের সন্ধ্যা থেকে। একই ধারণা দেখা যায় ইহুদি ধর্মেও। ইহুদি ক্যালেন্ডারেও দিন শুরু হয় সূর্যাস্তে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এক গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে, অন্ধকার থেকেই নতুন আলোর জন্ম।

বাংলা দিনের শুরু

বাংলা ক্যালেন্ডারের গল্পটি আরও জটিল ও আকর্ষণীয়। বর্তমান বাংলা সন মূলত একটি সৌরভিত্তিক ক্যালেন্ডার, যার প্রবর্তন মুঘল সম্রাট আকবর-এর আমলে (১৬ শতক)। এটি ফসলের মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য চালু করা হয়। বাংলা পঞ্জিকার গাণিতিক ভিত্তি মূলত সূর্যের গতির ওপর নির্ভরশীল (সৌরবর্ষ), তবে এর ওপর ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা ও হিন্দু পঞ্জিকার প্রভাবও রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার গ্রামীণ সমাজে ‘দিন বদল’ প্রায়ই সূর্যাস্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সন্ধ্যা নামলেই মানুষ নতুন দিনের প্রস্তুতি নিত। খাবার, বিশ্রাম, পরের দিনের পরিকল্পনা। ফলে সামাজিকভাবে সূর্যাস্তকে অনেক ক্ষেত্রে নতুন দিনের সূচনা হিসেবে ধরা হতো। অন্যদিকে পঞ্জিকা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে সূর্যোদয় ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা। কিন্তু আধুনিক সময়ে, বিশেষ করে সরকারি ও প্রশাসনিক কাজে, বাংলা দিনও এখন মধ্যরাত থেকেই শুরু ধরা হয়, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

সৌরবর্ষ বনাম চন্দ্রবর্ষ

দিনের শুরু নিয়ে এই ভিন্নতার পেছনে রয়েছে বছর গণনার পদ্ধতির পার্থক্যও। সৌরবর্ষ নির্ভর ক্যালেন্ডারে পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয়, প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা, তাকে ভিত্তি ধরা হয়। গ্রেগরিয়ান ও বাংলা ক্যালেন্ডার এই পদ্ধতি অনুসরণ করে। এর ফলে ঋতুগুলোর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের মিল থাকে। অন্যদিকে চন্দ্রবর্ষ নির্ভর ক্যালেন্ডার, যেমন হিজরি ক্যালেন্ডার চাঁদের চক্র অনুযায়ী চলে। এক চন্দ্রমাস প্রায় ২৯.৫ দিন। ফলে ১২ মাসে বছর হয় প্রায় ৩৫৪ দিন। এই পার্থক্যের কারণে ইসলামি মাসগুলো প্রতি বছর প্রায় ১০–১১ দিন এগিয়ে আসে। তাই রমজান কখনো গ্রীষ্মে, কখনও শীতে পড়ে। এখানেই স্পষ্ট হয়, সময় কোনো একক, চিরস্থায়ী সত্য নয়; এটি মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠা একটি কাঠামো। মানুষ তার প্রয়োজন, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার আলোকে সময়কে সংজ্ঞায়িত করেছে। তাই একই পৃথিবীতে থেকেও আমরা ভিন্ন ভিন্নভাবে দিন শুরু করি।

 

Read more — মতামত
Home