উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

মামদানির ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিজয়/ বিশ্বরাজনীতির জন্য নতুন বার্তা

৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৪০ অপরাহ্ণ
মামদানির ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিজয়/ বিশ্বরাজনীতির জন্য নতুন বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত মঙ্গলবারের দিনটি ছিল লালচিহ্নিত বিশেষ দিন। ইংরেজি প্রবাদবাক্য অনুসারে রেড লেটার ডে। এ দিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী নিউইয়র্কের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান পার্টির কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করেন তিনি। ভোটের গণনা শেষে দেখা গেছে, মামদানি একাই ১০ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছেন, যা কুয়োমো ও স্লিওয়ার সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি।

এই নির্বাচনে মামদানি নানা দিক থেকে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। প্রথমত, মামদানিই এখন নিউইয়র্কের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলমান মেয়র। তৃতীয়ত, ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়রও তিনি। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল বিরোধিতার মুখে নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে মেয়র নির্বাচিত হলেন। নিউইয়র্কের মেয়রের পাশাপাশি ভার্জিনিয়া ও নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটদের এই চতুর্মুখী জয় সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভোটার যে দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন চাইছেন, সেই ইঙ্গিত বহন করছে। তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানকে আগের তুলনায় আরও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখছেন। অথচ ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণার প্রায় পুরোটা সময় মামদানির তীব্র সমালোচনা করে গেছেন। এমনকি হুমকিও দিয়েছেন। তাকে ‘১০০ শতাংশ উন্মাদ কমিউনিস্ট’ বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি। মামদানি ভোটে জিতলে নিউইয়র্ক সিটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে, এমন কথাও বলেছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক আক্রমণের পরও নিউইয়র্কবাসীরা মামদানিকে নির্বাচিত করেছেন। তার সমর্থকরা আশা করছেন, নিউইয়র্কে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদেরও অনুপ্রাণিত করেছে এই ফল। আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দিকনির্দেশনাতেও তার জয় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, ভোটাররা বেশ কিছু যৌক্তিক কারণে মামদানি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম যে কারণটির কথা তারা বলছেন সেটা হচ্ছে, নীতি-নৈতিকতার জয়। মামদানি যেসব কথা বলে ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন তাতে ছিল নৈতিক স্বচ্ছতা। তিনি যা বিশ্বাস করেন, সেকথাই বলেছেন। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন তা হলো নাগরিক সেবা। এছাড়া আরও বেশ কিছু কারণে তিনি জয়ী হয়েছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে মনোযোগ, তৃণমূলে প্রচার ও তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা, প্রতিষ্ঠানবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি, নিউইয়র্কে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব, বক্তৃতায় দক্ষতা ও ব্যক্তিগত আন্তরিকতা, বহুমুখী ভোটার জোট এবং গাজাবাসীদের প্রতি সহানুভূতি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ ধনতান্ত্রিক দেশ। অর্থ-সম্পদের প্রাধান্য সেখানে। রাজনীতিতেও ধনীদের প্রাধান্য। রাজনীতিবিদরা ধনীদের চাঁদা বা ডোনেশনের ওপর নির্ভর করে থাকেন। তারা নীতি-নির্ধারণে লবিস্ট হিসেবে ধনীদের পক্ষে কাজ করেন। ফলে, ধনীরাই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওয়ালস্ট্রিট বা যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থ-ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের এসব ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নেই। সামাজিকভাবে প্রচণ্ড গতিশীল সমাজে তাদের অবস্থান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রান্তিক। মামদানি এই অচলায়তনের দুর্গে আঘাত হেনেছেন এবং একটি মহানগর নিউইয়র্কে ভূমিধস জয় পেয়েছেন। 

মামদানি এখন প্রকৃত বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন। তার প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। মামদানি নিজেও একথা বিলক্ষণ জানেন। নির্বাচনি জয়কে তিনি জওহরলাল নেহেরুর কথা দিয়ে উদযাপন করেছেন, ‘ইতিহাসে এই মুহূর্ত বিরল। আমরা পুরোনো থেকে নতুনের দিকে পা বাড়ালাম। একটা যুগ শেষ হলো, দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা একটা জাতির আত্মা নতুন ভাষা খুঁজে পেল।’ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাজনীতিবিদ এর আগে এভাবে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে পারেননি। তিনি আমাদেরকেও গৌরবান্বিত করলেন।

এখন অনেক দায়িত্ব মামদানির। জানুয়ারিতে তিনি যখন ম্যানহাটনের আপার ইস্ট সাইডে গ্রেসি ম্যানশনে উঠে যাবেন তখন তার কাজ হবে এক বিভক্ত শহরকে আবার একত্রিত করা। তবে সবচেয়ে বড় কাজ হবে নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ানো এবং মসৃণ করা। তবে তা যে খুব সহজ হবে তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণেই তার সমস্যা হতে পারি। তবে জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে তিনি যে জয় পেয়েছেন, তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি, আশা করা যায় তিনি পূরণ করবেন। ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রায় পুরো পৃথিবীজুড়ে এখন যে অস্থিরতা চলছে, আগামী দিনগুলোতে এর অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচন সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল। আমরা জোহরান মামদানিকে এই বিজয়ের জন্য আন্তরিকভাবে অভিনন্দিত করছি।

Read more — মতামত
Home