উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাজশাহী কলেজের দেড়শত বছর: ঐতিহ্যের মহামিলনের প্রস্তুতি

২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২০ অপরাহ্ণ
রাজশাহী কলেজের দেড়শত বছর: ঐতিহ্যের মহামিলনের প্রস্তুতি

রাজশাহী কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। দেড়শত বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত করেনি, তৈরি করেছে গড়ে ওঠা সমাজের নেতৃত্ব, সংস্কৃতি ও মননশীলতার বহু আলোকিত মানুষ। তাই রাজশাহী কলেজের ১৫০ বছর পূর্তি নিছক কোনো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়—এটি একটি ঐতিহ্যের উদযাপন, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সেতুবন্ধ এবং প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থীদের মহামিলনের উপলক্ষ।

রাজধানীতে আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনুর বক্তব্যে এই আয়োজনের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজশাহী কলেজকে তিনি ‘আমাদের সবার মা’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিষ্ঠানটির সব প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। কারণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ভবন, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠদানের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত পরিচয় ও বন্ধন।

রাজশাহী কলেজের দেড়শত বছরের ইতিহাসে বহু গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ১৫০ বছর পূর্তি নিছক আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে সত্যিকার অর্থেই একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মহাদেশভিত্তিক অ্যালামনাই কমিটি গঠন এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে আয়োজনের সাফল্য নির্ভর করবে এর সার্বিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর। বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও এই আয়োজনের কেন্দ্রীয় অংশীদার করতে হবে। একই সঙ্গে কলেজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাক্তন কৃতী শিক্ষার্থী এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোকে নথিভুক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

দেড়শত বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনাও ইতিবাচক। তবে এর পাশাপাশি রাজশাহী কলেজের ইতিহাস নিয়ে একটি সমৃদ্ধ আর্কাইভ, জাদুঘর বা ডিজিটাল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যেতে পারে। পুরোনো দলিল, ছবি, পত্রিকা, স্মৃতিচারণ, কৃতী শিক্ষার্থীদের তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করা গেলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

সরকারের সহযোগিতায় আধুনিক একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, আবাসন ও খেলার মাঠ উন্নয়নের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্য সংরক্ষণের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহী কলেজ তার অতীতের গৌরবকে ধারণ করেই ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

আমরা মনে করি, রাজশাহী কলেজের ১৫০ বছর পূর্তি হোক কেবল উৎসবের নয়, আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও উপলক্ষ। দেড়শত বছরের অর্জনকে স্মরণ করে আগামী ৫০ কিংবা ১০০ বছরের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী শিক্ষাভিশন তৈরি করা প্রয়োজন। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ করে রেখে যাওয়া যাবে।

রাজশাহী কলেজের ১৫০ বছর পূর্তি তাই রাজশাহী কলেজ পরিবারের একার আয়োজন নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সব প্রজন্মের অংশগ্রহণে এই মহামিলন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর ও অর্থবহভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা শুধু স্মরণীয় একটি উৎসবই হবে না—রাজশাহী কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ হয়ে উঠবে।

Read more — সম্পাদকীয়
Home