উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

লোডশেডিংয়ের এই দুর্ভোগের অবসান হোক

১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০১ অপরাহ্ণ
 লোডশেডিংয়ের এই দুর্ভোগের অবসান হোক

তীব্র গরমে মানুষ যখন একটু স্বস্তির জন্য বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন রাজশাহীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার, কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ এলেও স্থায়ী হচ্ছে না। কোথাও ১০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকার পরই আবার চলে যাচ্ছে। শহরে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে।

বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; মানুষের জীবনযাপন, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনের অপরিহার্য অবকাঠামো। অথচ বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে রাজশাহীর বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেচনির্ভর কৃষিতে প্রয়োজনের সময়ে বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হয় না, বাড়ে সেচের খরচ এবং ফসলহানির ঝুঁকি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট ছকও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর থাকছে না। একটি ফিডার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর চালু হচ্ছে, আবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অন্তত কখন বিদ্যুৎ পাবেন, সেই ধারণাটুকুও করতে পারছেন না। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই ঘাটতির বোঝা কীভাবে ন্যায্য ও সহনীয়ভাবে মানুষের ওপর দেওয়া হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু ঘরবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষকের সেচপাম্প বন্ধ, কারখানার মেশিন অচল, ওয়ার্কশপে কাজ থেমে যাচ্ছে, দোকানের ফ্রিজ-ডিপ ফ্রিজে পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাচ্ছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পণ্যের দাম ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, দিনমজুর ও কর্মজীবী মানুষ রাতে ঘুমাতে না পেরে পরদিন কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা বলে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—তিন স্তরেই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কোথায় কত ঘাটতি, কেন ঘাটতি এবং কোন এলাকায় কতক্ষণ লোডশেডিং হচ্ছে—এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে জনগণকে জানাতে হবে। অঘোষিত ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ায়।

একই সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকার জন্য কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি সেচের সময়সূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ফিডারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ সেচের একটি ঘণ্টার ব্যর্থতাও কোনো কোনো কৃষকের জন্য পুরো মৌসুমের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা—বর্তমান সংকটকে সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে না দেখে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। উৎপাদন ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে হবে। আর সংকট যতদিন থাকবে, ততদিন অন্তত পূর্বঘোষিত ও বাস্তবসম্মত লোডশেডিং সূচি অনুসরণ করা হোক।

রাজশাহীর মানুষ বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান চান। অন্ধকারে বসে অনিশ্চিত অপেক্ষা নয়—তাঁরা চান নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, যাতে কৃষকের সেচ চলে, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলে, রোগীর চিকিৎসা চলে এবং ব্যবসা-উৎপাদনের চাকা সচল থাকে। বিদ্যুৎ সংকটের এই দুর্ভোগের অবসানে এখনই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। 

 

Read more — সম্পাদকীয়
Home