উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অনিশ্চিত শিশুদের শিক্ষা ,নদী আছে, সেতু নেই-দায় কার

১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ
অনিশ্চিত শিশুদের শিক্ষা ,নদী আছে, সেতু নেই-দায় কার

বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব কয়েকশ গজ। অথচ সেই সামান্য পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় প্রায় ৩২ ফুট গভীর নদী। ওপারে যেতে হয় ছোট নৌকায়। বর্ষায় পানি ও স্রোত বাড়লে সেই পারাপার হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি। আর এখন পারাপারের একমাত্র নৌকাটিও ভেঙে পড়ে আছে। ফলে প্রায় পাঁচ মাস ধরে নদীর ওপারের ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থীর নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কেউ কলাগাছের ভেলায়, কেউবা সাঁতরে নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে—এ দৃশ্য শুধু একটি এলাকার যোগাযোগ সংকটের চিত্র নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন-ভাবনারও একটি নির্মম প্রশ্ন।

 

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯০৫ সালে। ১২১ বছর ধরে বিদ্যালয়টি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এত দীর্ঘ সময়েও বিদ্যালয়ের পাশের নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। একটি বিদ্যালয়ের বয়স যখন শতবর্ষ পেরিয়ে যায়, তখন সেখানে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের মৌলিক অধিকারটুকুও নিশ্চিত না হওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।

শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের কথা প্রায়ই বলা হয়। ঝরে পড়া রোধ, সবার জন্য শিক্ষা, শিক্ষার মানোন্নয়ন—এসব নিয়ে নানা কর্মসূচিও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি সেতুর অভাবে যদি ৭০-৮০টি শিশু মাসের পর মাস বিদ্যালয়ে যেতে না পারে, তাহলে সেই শিশুর কাছে শিক্ষার অধিকার কতটা বাস্তব? বই, উপবৃত্তি কিংবা বিদ্যালয় ভবন থাকলেই শিক্ষা নিশ্চিত হয় না; বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর নিরাপদ পথও শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরাই। নদী পার হওয়ার সময় তাদের ভয় থাকে, দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। অভিভাবকেরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। আবার সন্তানকে না পাঠালে পড়াশোনা পিছিয়ে পড়ে। একদিকে নিরাপত্তা, অন্যদিকে শিক্ষার ভবিষ্যৎ—দুইয়ের মধ্যে অসহায়ভাবে বেছে নিতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী থাকলেও এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। যোগাযোগের অভাব কীভাবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে, এটি তারই উদাহরণ।

সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনও এই যোগাযোগ সংকটে আটকে আছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। অর্থাৎ একটি সেতুর অভাব কেবল যাতায়াতের সমস্যা তৈরি করছে না; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অবশ্য আশার কথাও আছে। নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে বলে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় জানিয়েছে। কিন্তু যদি কাজ শুরু হতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে, তাহলে এই সময়টুকু কীভাবে পার হবে? শিশুদের শিক্ষা কি ততদিন অপেক্ষা করবে? বর্ষার নদী কি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সময়সীমা মেনে চলবে? কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে?

স্থায়ী সেতু নির্মাণ সময়সাপেক্ষ হলে অন্তত সাময়িক নিরাপদ ব্যবস্থা এখনই নিশ্চিত করা জরুরি। একটি উপযোগী নৌকা, নিরাপদ ঘাট এবং প্রশিক্ষিত মাঝির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে বর্ষাকাল বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষ পারাপার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের সহযোগিতার যে কথা বলা হয়েছে, সেটিও দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় প্রকল্প নয়। মানুষের প্রয়োজনের জায়গায় একটি ছোট সেতুও কখনো কখনো একটি বিশাল উন্নয়ন। নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সেই সেতুটি হয়তো কয়েকশ গজ পথকে নিরাপদ করবে, কিন্তু তাদের কাছে সেটিই হতে পারে শিক্ষা ও ভবিষ্যতের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ।

শতবর্ষী একটি বিদ্যালয়ের শিশুরা আর কতদিন নদীর দিকে তাকিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথ খুঁজবে? রাষ্ট্র যদি সত্যিই প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে নদীর এই সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে নয়, শিশুদের ভবিষ্যতের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি জরুরি অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সেতুটি দ্রুত নির্মিত হোক-আর তার আগ পর্যন্ত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক। একটি শিশুও যেন নদীর কারণে স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে।

 

Read more — সম্পাদকীয়
Home