
স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। দেশ এগিয়েছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই পৌঁছেছে আধুনিকতার নানা সুযোগ-সুবিধা। বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। অথচ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মাতীরের দুর্গম চর আষাড়িয়াদহের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ এতদিন এই মৌলিক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত ছিলেন। শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে থেকেও তাদের রাত কাটাতে হয়েছে কুপি, হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয়। এটি নিছক একটি অব্যবস্থাপনা নয়, বরং উন্নয়নের সুফল বণ্টনে দীর্ঘদিনের এক নির্মম বৈষম্যের চিত্র।
অবশেষে সেই অন্ধকার কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন চর আষাড়িয়াদহে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার আগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দুর্গম চরাঞ্চলটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয় মানুষের মতামত শুনেছেন। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে চরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলে, ঘোষণা যেন কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এর সার্থকতা প্রমাণ করতে হবে।
বিদ্যুৎ না থাকার কারণে চর আষাড়িয়াদহের মানুষ শুধু রাতের অন্ধকারেই ছিলেন না, উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়েছেন। শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে, গৃহিণীদের দৈনন্দিন কাজ হয়েছে কষ্টসাধ্য, অসুস্থ মানুষ চিকিৎসাসেবায় পড়েছেন নানা বিড়ম্বনায়। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে সীমিত পরিসরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা হলেও সেটিও ২০২৪ সালের জুনে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে চরবাসীর।
তবে বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেই চর আষাড়িয়াদহের সব সমস্যা সমাধান হবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি পদ্মার ভাঙন। প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থাপনা বিলীন হয়। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং বাজারব্যবস্থার দুর্বলতাও চরবাসীর জীবনকে কঠিন করে রেখেছে। ফলে বিদ্যুৎ সংযোগকে একটি বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত চর আষাড়িয়াদহের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা। বিদ্যুৎ সংযোগের পাশাপাশি টেকসই সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ নৌযান ও ঘাটব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে পদ্মার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণ জরুরি। বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষকে কেবল ভোটের সময় নয়, সারা বছরই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
চর আষাড়িয়াদহে বিদ্যুতের আলো জ্বালানোর উদ্যোগ তাই কেবল কয়েক হাজার ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি সমান অধিকার ও উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নেরও একটি পরীক্ষা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যে আশার আলো দেখা দিয়েছে, তা যেন দ্রুত বাস্তবতার আলোয় পরিণত হয়—এটাই প্রত্যাশা।
চরবাসীর ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলুক। সেই আলোর সঙ্গে আলোকিত হোক তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ। পদ্মার চরের মানুষ আর উন্নয়নের প্রান্তিক বাসিন্দা হয়ে নয়, সমান অধিকার নিয়ে দেশের অগ্রযাত্রার অংশীদার হোক—এখন সময় সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার।

