
সকাল গড়াতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে রাজশাহী নগরীর রেলগেট। একের পর এক বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটো আর মোটরসাইকেলের ছুটে চলা। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজতে থাকে হর্ন। পথচারী কিংবা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কানে তখন স্বাভাবিক কথাবার্তার চেয়ে যানবাহনের শব্দই বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। একই চিত্র হাসপাতালকেন্দ্রিক লক্ষ্মীপুর মোড়েও। রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও পথচারীদের ভিড়ের মধ্যেও থামছে না অপ্রয়োজনীয় হর্ন।
শব্দের এই অব্যবস্থাপনার সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। রাজশাহী নগরীর রেলগেট ও লক্ষ্মীপুর মোড়ে সরেজমিন শব্দমাত্রা পরিমাপ করে পাওয়া গেছে ১০০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ। শনিবার ব্যস্ত সময়ে পরিচালিত পরীক্ষায় রেলগেটে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা পাওয়া গেছে ১০১ দশমিক ৫ ডেসিবেল। আর লক্ষ্মীপুর মোড়ে তা আরও বেশি—১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এবং বারিন্দ এনভায়রনমেন্টের সহযোগিতায় এই পরিমাপ করা হয়। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রেলগেট এবং সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর মোড়ে শব্দমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় একই সময় ও একই স্থানে গত বছর পরিচালিত পরিমাপে দুই এলাকাতেই সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল প্রায় ৯৭ ডেসিবেল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শব্দদূষণ আরও বেড়েছে।
শুধু পরিমাপের সংখ্যাই নয়, নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাও বলছে শব্দদূষণ এখন রাজশাহীর নগরজীবনের অন্যতম বড় অস্বস্তির কারণ। বিশেষ করে ব্যস্ত মোড়গুলোতে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো, যানজটের মধ্যে একসঙ্গে একাধিক যানবাহনের হর্ন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উচ্চ শব্দ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, শব্দদূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি মানসিক চাপ, বিরক্তি, ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় এর প্রভাব আরও বেশি উদ্বেগজনক।
বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর মোড়ের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান এই এলাকায়। রোগী ও স্বজনদের জন্য যেখানে শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন, সেখানেই পরিমাপ করা হয়েছে ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল শব্দ। ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকায় শব্দদূষণের এই মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নগর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে।
পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশের শব্দদূষণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী শব্দমাত্রার ভিত্তিতে এলাকাকে নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প—এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। দিনের বেলায় বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৭০ ডেসিবেল এবং নীরব এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল। সেই হিসাবে রেলগেটের ১০১ দশমিক ৫ এবং লক্ষ্মীপুর মোড়ের ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল অনুমোদিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও ব্যাটারিচালিত অটোর শব্দ নগরীর শব্দদূষণের অন্যতম কারণ। হর্ন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। শব্দদূষণ মানুষের পাশাপাশি নগরের জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজশাহীতে শব্দদূষণের ভয়াবহতার বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ২০২২ সালের প্রতিবেদনে রাজশাহীকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক শব্দদূষিত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে শহরটির শব্দমাত্রা প্রায় ১০৩ ডেসিবেল বলে উল্লেখ করা হয়। চার বছর পর স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালিত পরিমাপেও যখন শব্দমাত্রা ১০০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন পুরোনো সেই সতর্কবার্তাই যেন নতুন করে সামনে এসেছে।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ২০২২ সাল থেকে একই স্থান ও প্রায় একই সময়সূচিতে রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ধারাবাহিকভাবে শব্দমাত্রা পরিমাপ করছে। এবারের পরিমাপও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। পাশাপাশি সংস্থাটি শব্দদূষণবিরোধী লিফলেট বিতরণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিও পালন করে আসছে।
তবে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ। নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে অপ্রয়োজনীয় হর্ন বন্ধে আইন প্রয়োগ, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় নীরবতা নিশ্চিত, যানবাহনের শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু চালকদের সচেতন করলেই হবে না; নগর পরিকল্পনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

