উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অন্যায়ের প্রতিবাদ হোক, অনাচার নয়

রেলস্টেশনে ভাঙচুর
২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ অপরাহ্ণ
অন্যায়ের প্রতিবাদ হোক, অনাচার নয়

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যে ঘটনা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় ভাঙচুর শুধু কিছু অবকাঠামোর ক্ষতি নয়; এটি জনসম্পদ, নাগরিক শৃঙ্খলা এবং আমাদের সামষ্টিক দায়িত্ববোধের ওপরও আঘাত। ক্ষোভের কারণ যতই গুরুতর হোক, প্রতিবাদের নামে জনসম্পদ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।

গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর চালায়। ঘটনাটি নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চারজনকে বরখাস্ত করেছে। পরে বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের শনাক্ত করার সময়।

একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। কোনো রেলকর্মী বা নিরাপত্তাকর্মী অন্যায় করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায় করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ সত্য হলে সেটি যেমন নিন্দনীয়, তেমনি সেই অভিযোগের জেরে রেলস্টেশনে ভাঙচুরও সমানভাবে নিন্দনীয়।

দুঃখজনক হলো, আমাদের সমাজে অনেক সময় ন্যায়বিচারের দাবি আর উত্তেজনাকে একাকার করে ফেলা হয়। কোনো একটি ঘটনায় ক্ষোভ তৈরি হলেই একটি পক্ষ দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, এরপর বিচার ও তদন্তের আগেই শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা দেখা যায়। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। কারণ আইনের শাসনের জায়গায় যদি দলবদ্ধ শক্তি ও আবেগ স্থান নেয়, তাহলে আজ যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হচ্ছে, আগামীকাল সেই একই শক্তি অন্য কারও ওপর অন্যায় করতে পারে।

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, অর্থাৎ জনগণের সম্পদ। স্টেশনের একটি দরজা, জানালা, চেয়ার, কাউন্টার কিংবা অন্য কোনো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত তার খরচ বহন করতে হয় জনগণকেই। তাই জনসম্পদ ধ্বংস করে কোনো দাবি আদায় করা যায় না; বরং জনগণেরই ক্ষতি হয়।

ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু স্টেশন পরিদর্শন করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন উত্তেজনা কমানো এবং সত্য উদঘাটন করা। তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপে প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করাও চলবে না।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে গুজব একটি ঘটনাকে মুহূর্তের মধ্যে বড় সংকটে পরিণত করতে পারে। তাই কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। আবার গুজব ছড়ানোর অভিযোগে কাউকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ না করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কঠোর ভাষা নয়, বরং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

এ ঘটনার দায় শুধু যারা ভাঙচুর করেছে তাদের ওপর চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ কেন উঠল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, পরিস্থিতি কেন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে রেলওয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

রাজশাহী একটি শিক্ষানগরী। এই শহরের শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে—এটাই স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু প্রতিবাদের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ থাকে। ভাঙচুর কখনো প্রতিবাদের শক্তি নয়; এটি প্রতিবাদের দাবিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

আমরা চাই, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ঘটনার তদন্ত দ্রুত শেষ হোক। শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের শাস্তি হোক। স্টেশনে ভাঙচুরের সঙ্গে যারা জড়িত, প্রমাণের ভিত্তিতে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। কোনো পরিচয়, পদ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়।

রাজশাহীর ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব সবার। এই দায়িত্ব পালনের অর্থ শুধু পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণ নয়; বরং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ হবে—কিন্তু জনসম্পদ ধ্বংস হবে না; অভিযোগের বিচার হবে—কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হবে না।

প্রতিবাদের অধিকার থাকবে, ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার থাকবে; কিন্তু জনসম্পদ ধ্বংসের অধিকার কারও নেই। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ঘটনা থেকে আমাদের এই শিক্ষা নিতেই হবে।

Read more — সম্পাদকীয়
Home