উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

দুই বছরেও মেলেনি রাজশাহীর দুই শিক্ষার্থী হত্যার বিচার

জুলাই গণঅভ্যুত্থান
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ
দুই বছরেও মেলেনি রাজশাহীর দুই শিক্ষার্থী হত্যার বিচার

দেয়ালে এখনো টাঙানো ছেলের ছবি। প্রতিদিন সকালে ছবির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন মা। বুকের ভেতর একই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—'আর কতদিন?' বাবা আজও বিশ্বাস করতে পারেন না, যে ছেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিল, সে এখন শুধু একটি ফ্রেমবন্দি ছবি। অন্যদিকে আরেকটি পরিবারও একই অপেক্ষায়। কলেজপড়ুয়া ছেলের ঘর যেমন ছিল, তেমনই আছে। শুধু সে আর ফেরেনি।

 

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীর দুই শহীদ সাকিব আনজুম সবুজ (২৭) ও আলী রায়হানের (২৮) পরিবার আজও অপেক্ষা করছে বিচার, স্বীকৃতি এবং সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য—যে স্বপ্ন নিয়ে তাদের সন্তানেরা জীবন দিয়েছিল।

 

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের ঠিক আগমুহূর্তে রাজশাহীতে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাকিব আনজুম সবুজ নিহত হন। এছাড়া উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ৪০ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে ৩০ জনই ছিলেন গুলিবিদ্ধ। গুরুতর আহত আলী রায়হান চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ আগস্ট মারা যান।

 

নিহত সাকিব আনজুম সবুজ রাজশাহী নগরীর রানীনগর এলাকার মাইনুল ইসলামের ছেলে। তিনি বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঘটনার দিন ধাওয়া খেয়ে শাহ মখদুম কলেজসংলগ্ন একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবারের অভিযোগ, সেখানেই আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করে।

 

অন্যদিকে আলী রায়হান রাজশাহী কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

সেই রক্তাক্ত দিনের দুই বছর পার হলেও বহুল আলোচিত দুই হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি। চার্জশিট জমা পড়েছে, কিন্তু মামলার অগ্রগতি নিয়ে অসন্তুষ্ট শহীদ পরিবার।

 

সাকিব আনজুম সবুজের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, 'ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার দেখে মরতে চাই। এটাই এখন আমাদের একমাত্র চাওয়া।'

 

তার বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, 'আমার ছেলে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে আন্দোলনে যায়নি। সে একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দুই বছর পরও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখছি না।'

 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, মামলার গতি অত্যন্ত ধীর। পাশাপাশি শহীদ পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের প্রত্যাশিত দায়িত্বও চোখে পড়েনি। অথচ শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা একবারও শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজ নেননি। শুধু স্মরণসভা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

 

তিনি আরও বলেন, 'আমরা কোনো আর্থিক সুবিধার জন্য কথা বলছি না। আমাদের সবচেয়ে বড় দাবি, হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তাহলে অন্তত মনে হবে আমাদের সন্তানের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।'

 

একই ঘটনার আরেক শহীদ আলী রায়হানের পরিবারও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছে। তার ভাই রানা ইসলাম বলেন, 'জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়া। কিন্তু দুই বছর পরও সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। চার্জশিট হয়েছে, কিন্তু বিচার কবে শেষ হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।'

 

আলী রায়হানের বাবা মুসলেম উদ্দিন বলেন, 'আমাদের ছেলেরা জীবন দিল, অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে বিচার নিয়ে মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। আমরা চাই, আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হোক।'

 

সূত্রে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয় পুলিশ। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ মোট ২৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগপত্র দাখিলের পর বিচারিক কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে এগোয়নি বলে দাবি করছেন স্বজনরা।

 

আইনজ্ঞদের মতে, বহুল আলোচিত এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। অন্যদিকে দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর হতাশা আরও বাড়বে। তাই মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

দুই বছরে জুলাই শহীদদের স্মরণে নানা আলোচনা, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা হয়েছে। রাজশাহীতে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ঘোষণাও এসেছে। কিন্তু শহীদ পরিবারগুলোর মতে, স্মৃতিস্তম্ভ বা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হলো বিচার।

 

তাদের অভিযোগ, প্রত্যাশিত সম্মানও তারা পাননি। যে আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাদের সন্তানেরা জীবন দিয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যও এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই বেশি ব্যস্ত—এমন আক্ষেপও রয়েছে তাদের।

 

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আলী আশরাফ মাসুম বলেন, 'দুই হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও বিষয়টি তদন্ত করছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করছে।'

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home