
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিলকুমারি-বিলজোয়ানা জলাভূমি নির্ভর প্রাণী অভয়ারণ্যের কার্যকর সুরক্ষা, সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন এবং জলজ প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, কৃষক, মৎস্যজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার গোকুল-মথুরা গ্রামের বিলপাড়ে আয়োজিত এক জনসমাবেশ থেকে তারা এ দাবি জানান। উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক) ও গ্রীণ কোয়ালিশনের যৌথ উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, গত বছরের ৭ মে সরকারিভাবে বিলকুমারি-বিলজোয়ানাকে ‘জলাভূমি নির্ভর প্রাণী অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়। অথচ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ মিঠাপানির জলাভূমি দেশীয় মাছ, জলচর পাখি, উভচর ও সরীসৃপসহ নানা জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। একই সঙ্গে এটি ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।
সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, বর্তমানে চায়না দুয়ারি (মশারি) জাল, কারেন্ট জাল, বিষটোপ ও বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ শিকার এবং বিলসংলগ্ন এলাকায় অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার বিলের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব কারণে দেশীয় কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পুঁটি, টাকি, গজার, পাতাশি, ভেদা ও খলিসাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার ও কৃষিবিদ অমৃত সরকার বলেন, অভয়ারণ্য ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ এবং কীটনাশক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয় জেলে আবু সামাদ বলেন, চায়না দুয়ারি জাল, কারেন্ট জাল, বিষটোপ ও বৈদ্যুতিক শকে মাছ শিকার বন্ধ না হলে দেশীয় মাছ বিলুপ্তির মুখে পড়বে। তিনি বাজারে এসব জালের সরবরাহ বন্ধেরও দাবি জানান।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক বলেন, সংরক্ষিত এলাকার ঘোষণা শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ধ্বংসাত্মক মাছ শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করে বিলটিকে উত্তরাঞ্চলের জলাভূমি সংরক্ষণের মডেলে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বপ্নচারী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি রুবেল হোসেন মিন্টু বলেন, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। আর এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী কৃষক হারুনুর রশিদ বলেন, নিরাপদ কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিল, প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থ একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব।
সমাবেশ থেকে বক্তারা বিলকুমারি-বিলজোয়ানা অভয়ারণ্যের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, বিলসংলগ্ন এলাকায় অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও জলচর প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং বিল দখল, ভরাট, দূষণ ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি অভয়ারণ্যের আইনি মর্যাদা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, বিলকুমারি-বিলজোয়ানাকে রক্ষা করা মানেই জীববৈচিত্র্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা।

