উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রামেকে ৭০ দিনে সাড়ে তিন শতাধিক সাপে কাটা রোগী ভর্তি

মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে রাসেলস ভাইপার
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০৪ অপরাহ্ণ
রামেকে ৭০ দিনে সাড়ে তিন শতাধিক সাপে কাটা রোগী ভর্তি

রাজশাহী নগরীর বাশার (২২) নামে এক যুবক সন্ধ্যায় পদ্মার ধারে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটছিলেন। হঠাৎই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে বিষধর সাপ। মুহূর্তেই ছোবল। দৌড়ে নিয়ে আসা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—ভর্তি হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টার মাথায় শেষ হয়ে যায় তরুণ জীবনের সব স্বপ্ন। হাসপাতালের করিডরে তখন শুধু কান্নার শব্দ।

এমন গল্প শুধু বাশারের নয়। গত জুলাই থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৭০ দিনে রামেকে ভর্তি হয়েছেন ৩৫১ জন সাপে কাটা রোগী। হাসপাতালের রেকর্ড বলছে, গত ১৪ বছরে একসঙ্গে এত রোগী কখনো আসেনি। তবে মৃত্যুহার কমেছে। হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তিকৃত রোগীদের মৃত্যুহার গত বছর ছিল ২৪ শতাংশ। এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ শতাংশে। চিকিৎসকেরা বলছেন, সচেতনতা বেড়েছে বলেই কিছুটা হলেও মৃত্যুহার কমছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো রাসেলস ভাইপার। এ বছর এ সাপের ছোবলে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন সাতজন, এর মধ্যে ছয়জনই মারা গেছেন। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো হাসপাতালে আনা গেলে এ মৃত্যুও ঠেকানো যেত।

জানা যায়, সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের তরুণ আরিফুল ইসলাম (২৫) ধান কাটতে গিয়ে সাপের কামড়ে আহত হন। বাঁ হাতে দাগ দেখিয়ে তিনি বললেন, “ধান কাটতে নামার আগেই দুইটা সাপ মেরেছিলাম। তারপরও আরেকটা এসে কামড় দিল। ভাগ্য ভালো, সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চলে এসেছি, না হলে হয়তো আজ বেঁচে থাকতাম না।”

অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ইমন প্রথমে গিয়েছিলেন স্থানীয় হাসপাতালে, তারপর পরিবারের চাপে ওঝার কাছে। এতে শুধু সময়ই নষ্ট হয়নি, অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। অবশেষে রামেকে এনে বাঁচানো গেছে তাকে। তার মামা মোহাম্মদ তুহিন বলেন, “ওঝার ওপর ভরসা ছিল না, তাই শেষমেশ মেডিকেলে এনেছি। এখন ভালো আছে।”

পদ্মা-যমুনার চরাঞ্চলে রাসেলস ভাইপারের প্রাদুর্ভাব এখন বড় আতঙ্ক। স্থানীয়রা বলছেন, গত ১০ দিনে পাঁচ–সাতটি রাসেলস ভাইপার মারা পড়েছে। কারও কারও বাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ছে এসব বিষধর সাপ। এ আতঙ্ক ঠেকাতে কোথাও কোথাও কৃষকদের গামবুট বিতরণ করা হচ্ছে। এদিকে, রামেক হাসপাতালে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে অ্যান্টিভেনম। তবে প্রতিটি রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ২৭০ জন নির্বিষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হলেও ৮১ জনকে ছোবল দিয়েছে বিষধর সাপ। এর মধ্যে শুধু রাসেলস ভাইপারের ছোবলেই প্রাণ গেছে ৬ জনের।

রামেক আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বললেন, “যেসব রোগীর মৃত্যু হচ্ছে, তাঁরা সবাই অনেক দেরিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। সাপে কামড়ানোর পর দ্রুত হাসপাতালে এলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ইচ্ছা—একজন সাপে কাটা রোগীও যেন মারা না যায়। তাই বলছি, মাঠে কাজ করতে গেলে অবশ্যই গামবুট ব্যবহার করুন, আর সাপে কামড়ালে ওঝার কাছে নয়, সোজা হাসপাতালে আসুন।”

 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home