উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে চাপে কৃষক-ব্যবসায়ী

উত্তরা প্রতিবেদক ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে চাপে কৃষক-ব্যবসায়ী

হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খরচ বাড়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদর ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

রাজশাহীর কৃষি খাতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না, যা ফসলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক তাবারক হোসেন বলেন, জমিতে ধান লাগিয়েছি, কিন্তু তেলের সংকটের কারণে ঠিকমতো সেচ দিতে পারিনি। এখন আবার দাম বাড়ায় খরচ আরও বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে যে টাকা খরচ করছি, তা তুলতে পারব কি না সন্দেহ। এভাবে আবাদ করে লাভ কী?

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পবা উপজেলার আরেক কৃষক আবুল কালাম। তিনি বলেন, আগে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে যে খরচ হতো, এখন তার তুলনায় অনেক বেশি লাগছে। সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি–সবকিছুর দাম আগেই বেড়েছিল, এখন তেলের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে গেছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সেচ কমিয়ে দিচ্ছেন, এতে ফলন কমে যাবে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন খাতে। পুঠিয়া উপজেলার সবজি ব্যবসায়ী মানিক হোসেন বলেন, আগে ৫০০ টাকায় নসিমন বা ভটভটিতে করে সবজি শহরে আনতাম। এখন তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার কমে আসতে চায় না। তারা বলছে, তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়া বাড়াতে হয়েছে। এতে আমাদের লাভ কমে যাচ্ছে, আবার বেশি দামে বিক্রি করলে ক্রেতারাও কিনতে চায় না।

শহরাঞ্চলেও একই চিত্র। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পণ্য আনার খরচ বেড়ে গেছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরাও চাপে পড়েছেন। তাদের অধিকাংশই মোটরসাইকেলের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী আজিজুল হক বলেন, আমাদের সারা দিন বাইকে চলতে হয়। আগে থেকেই তেলের সংকট ছিল, এখন দামও বেড়েছে। প্রতিদিনের খরচ এত বেড়ে গেছে যে কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় কোম্পানি অতিরিক্ত খরচ দেয় না, ফলে নিজের পকেট থেকেই দিতে হচ্ছে। চাকরি টিকিয়ে রাখা নিয়েও চিন্তায় আছি।

সাধারণ ভোক্তারাও এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নগরীর এক ক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে গেলে দেখি প্রতিদিনই কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু খরচ বাড়ছে। এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। এর ফলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, বাজারজাতকরণ–সব খাতেই খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই এসে পড়ে। কেননা কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের বাজারদর বাড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়। যদি দ্রুত কোনো সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারকে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি বৃদ্ধি, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি না ঘটে।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home