উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

শিক্ষক রোজনামচা

মো. আতিকুজ্জামান রানা ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪১ অপরাহ্ণ
শিক্ষক রোজনামচা
মো. আতিকুজ্জামান রানা

“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”— এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটির অন্তর্নিহিত অর্থ আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। কারণ, শিক্ষার সেই মেরুদণ্ডকে দৃঢ় ও সোজা রাখার দায়িত্ব যাদের, সেই শিক্ষক সমাজ আজ নিজেরাই অবলম্বনহীন হয়ে পড়েছেন। অথচ জাতির মেরুদণ্ডকে যারা নৈতিক চেতনা ও মানবিক শিক্ষার আলোয় উজ্জীবিত করে, তারা-ই প্রকৃত অর্থে শিক্ষক।

শিক্ষকতা এক অবিরাম শিক্ষানবিশীর পথ। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “শিক্ষককে অবশ্যই সর্বাঙ্গীণভাবে পবিত্র হতে হবে। তখনই তার কথায় শক্তি সঞ্চার হবে, যখন তিনি নিজেকে ছাত্রের স্তরে নামিয়ে আনতে পারবেন।”

অর্থাৎ শিক্ষককে হতে হবে ছাত্রদরদি, আর ছাত্রদের গড়ে তুলতে হবে শিক্ষকদরদি করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই শিক্ষা হয়ে ওঠে মানবগঠনের চাবিকাঠি।

আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক আমাদের বাবা-মা—যারা আমাদের জীবনের হাতেখড়ি দেন। পরবর্তী পর্যায়ে স্কুলে গিয়ে আমরা পাই আরও একদল পথপ্রদর্শককে—যারা আমাদের মনের পরিধি, চিন্তার জগৎ ও নৈতিকতা গড়ে তোলেন। শিক্ষক কেবল পাঠদাতা নন, তিনি চরিত্রগঠনের কারিগর, সমাজমানসের নির্মাতা। শিশুরা শিক্ষকের আচরণে শেখে কীভাবে সম্মান করতে হয়, কীভাবে মেনে চলতে হয় সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ।

গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল যথার্থই বলেছিলেন— “যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী, তারা অভিভাবকদের চেয়েও বেশি সম্মানীয়; কারণ পিতা-মাতা শুধু জীবন দেন, কিন্তু শিক্ষক সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলেন।”

জাপানের একটি প্রবাদে বলা হয়— “Better than a thousand days of diligent study is one day with a good teacher.” অর্থাৎ, একজন ভালো শিক্ষকের সংস্পর্শ হাজার দিনের অধ্যবসায়ের চেয়েও মূল্যবান।

প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষাদান এমন এক পেশা, যা অন্য সব পেশার জন্ম দেয়। ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচারক, প্রশাসক—সবাই একসময় কোনো না কোনো শিক্ষকের শিষ্য ছিলেন। তবু আজ সেই শিক্ষক সমাজ অবমূল্যায়িত, বঞ্চিত, উপেক্ষিত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, একসময় শিক্ষকের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন স্রষ্টা, আর এখন তা নির্ধারণ করে তাঁরই কোনো প্রাক্তন ছাত্র। সমাজে শিক্ষকের ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলেই তাঁর মর্যাদাও শূন্যের কাছাকাছি। কলমের আলোর পাশে ক্ষমতার আলো আজ বড়ই ম্লান—এই সত্য জাতি যেন বিস্মৃত।

রাষ্ট্র সংস্কারের এই সময়টিতে একটাই প্রত্যাশা— শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা ও সামাজিক বৈষম্য দূর হোক। কারণ, শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান না দিলে, জাতির মেরুদণ্ড কখনোই সোজা হবে না।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, চকএনায়েত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঘা, রাজশাহী। 

Read more — মতামত
Home