
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নভেম্বরে গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে না নিলে আগামী ১১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার চিত্র ভিন্ন হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের তারিখ জানানো হবে আগামী ১৩ নভেম্বর। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই দিনটিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। সব মিলিয়ে জনমনেও এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-অস্বস্তি কাজ করছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘দেশ যদি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাহলে পরাজিত পলাতক ফ্যাসিবাদী অপশক্তির পুনর্বাসনের পথ সুগম হতে পারে।’ একই আশঙ্কা ও সতর্কবার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কণ্ঠেও। তাঁদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলো যেভাবে বিভেদ-অনৈক্যের পথে এগিয়ে চলেছে, তাতে জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান এখন একেবারেই বিপরীত মেরুতে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ জন্য অনেকেই ঐকমত্য কমিশন বা সরকারকেই দায়ী করছেন।
জুলাই সনদ প্রণয়নকালে সমঝোতার স্বার্থে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি ও ভিন্নমত) রাখা হয়েছিল এবং তার ভিত্তিতে দলগুলো সনদে সই করেছিল। কিন্তু গত ২৮ অক্টোবর সরকারের কাছে হস্তান্তর করা জুলাই সনদে সেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা হয়নি।
জামায়াত ও এনসিপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ না রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত সাংবিধানিক আদেশ জারি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি জামায়াত ও এনসিপির। কিন্তু সেই দাবি মানতে রাজি নয় বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। গত শনিবার জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের পর নেতারা বলেন, জনগণের পাঁচ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে আগামী ১১ নভেম্বরের জনসভা থেকে কঠোরতম কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পাঁচ দফার মধ্যে রয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং ওই আদেশের ওপর জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সব জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা এবং জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ পুনরায় রাজনীতির মাঠে ফেরার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রায়ই ঝটিকা মিছিল করছে। পার্শ্ববর্তী দেশের গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ‘লকডাউন’ কর্মসূচি পালন করবে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ‘সোমবার থেকে রাস্তায় নামছে আওয়ামী লীগ।’ আর রাস্তায় নামার উপায় হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমরা আশা করি, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বেশি সহনশীলতার পরিচয় দেবে। আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ দূর করে গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূরণে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।

