
রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই জটিল হচ্ছে। টেকনাফের বাতাসে এখন অস্ত্রের ঝনঝনানি। রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের পাশাপাশি ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানা রকম অপরাধ তৎপরতা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। খুনাখুনি লেগেই আছে। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থানীয় লোকজন এখন রোহিঙ্গাদের হাতে রীতিমতো জিম্মি। আট বছর ধরে চলা এই রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর এক অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে রেখেছে। এর একটিই মাত্র সমাধান আছে, তা হলো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
সম্প্রতি জাতিসংঘে আয়োজিত এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সত্যটি আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। এই সংকট মায়ানমারের সৃষ্টি, আর এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন যখন ক্রমেই কমে আসছে এবং বিশ্বসম্প্রদায় যখন অন্যান্য সংকটে ক্রমে বেশি করে জড়িয়ে পড়ছে, তখন প্রত্যাবাসন শুরু করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও মানবিক পথ।
ড. ইউনূসের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। দেশের সীমিত সম্পদ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাদকপাচারসহ অপরাধমূলক কার্যকলাপের কারণে দেশের সামাজিক কাঠামোও হুমকির সম্মুখীন। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের দীর্ঘকাল ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য কোনো টেকসই বিকল্প হতে পারে না।
সংকটের গভীরতা অনুধাবন করে ড. ইউনূস যে সাত দফা পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুচিন্তিত। এর মূল ফোকাস হলো মায়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করে সহিংসতা বন্ধ করা, রাখাইনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা।
একই সঙ্গে রাখাইনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গাদের সমাজের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে আস্থা তৈরি করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
সম্মেলনে ড. ইউনূস বিশ্বনেতাদের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপের যে দাবি জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত যৌক্তিক। আট বছর পেরিয়ে গেলেও মায়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাই কথার ফুলঝুরি নয়, এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পূর্ণ সহায়তা দেওয়া এবং মায়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা। তা না হলে শুধু বাংলাদেশের নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।
রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রত্যাবাসনই একমাত্র মানবিক ও স্থায়ী সমাধান।

