উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাবিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও পেলেন উপ-উপাচার্য পদ

উত্তরা প্রতিদিন শাকিবুল হাসান, রাবি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৩ অপরাহ্ণ
রাবিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও পেলেন উপ-উপাচার্য পদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগের সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধে বিভাগের তহবিলের অর্থ নিয়ম বহির্ভূত এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করার অভিযোগ উঠেছে। সভাপতি থাকা অবস্থায় তিনি প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো হিসাব দেননি। বিভাগ থেকে তাকে এ বিষয়ে কয়েকবার চিঠি পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাডেমিক সকল কাজ থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। বর্তমানে তিনি মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

উর্দু বিভাগের ওই শিক্ষক হলেন অধ্যাপক আতাউর রহমান। তিনি ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব ছাড়ার আড়াই বছর পার হলেও তিনি এখানো কোনো হিসাব দেননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী সংগঠন ইউট্যাবের সদস্য।

বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, উর্দু বিভাগের তহবিল থেকে তিনি সর্বমোট ২৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮০ টাকা উত্তোলন করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি সভাপতির দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন এবং পরবর্তীতে তাঁকে মৌখিকভাবে একাধিকবার বলার পরেও তিনি উক্ত টাকার কোনো প্রকার হিসাব ও ভাউচার জমা দেননি। এরপর বিভাগের একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ অধ্যাপক আতাউর রহমানকে চিঠি পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরবর্তীতে তাঁকে আরো দুটি তাগিদ পত্র পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। এরপর একাডেমিক কমিটি বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ম বহির্ভূতভাবে এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করার সন্দেহ পোষণ করে। এরপর ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরে তদন্তের জন্য সকল কাগজপত্র পাঠানো হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ ডিসেম্বর বিভাগের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবুও গত ২৭ জুলাই তিনি মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।

সমালোচনা বিভিন্ন মহলে:

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক জৈষ্ঠ্য অধ্যাপক বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষককে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই নিজ বিভাগে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে শাস্তিপ্রাপ্ত। এই শিক্ষকরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিএনপিপন্থী সংগঠন ইউট্যাবের বিভিন্ন পদে আছে। বারবার এই সংগঠনের শিক্ষকদেরই সব জায়গায় দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।’

রাবি হিউমান রাইটস ডিফেন্ডার’স সোসাইটির সভাপতি আলফাজ উদ্দিন টনিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগে যার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাকেই আবার অন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো অত্যন্ত লজ্জাজনক ও হতাশাজনক। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দুর্বলতাই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার প্রতি চরম অবহেলার বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক আনুগত্য যদি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকেও ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার যোগ্যতা হয়ে ওঠে, তাহলে এমন নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। তাকে বিভাগীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে। এমন ব্যক্তিকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য করা হয়েছে। তিনি প্রথমেই শিক্ষকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরাহা না করতেই এই সিদ্ধান্ত অনিয়মকেই ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও আমরা সবকিছুকে দলীয়করণের একটা প্রবণতা দেখেছি। বর্তমানেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাইয়ের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের এই বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত।’

অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, ‘এটা ততকালীন নকীব প্রশাসনের সময়ে আমার বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত। আমার মান ক্ষুণ্ন করার জন্য বিভাগের বর্তমান সভাপতি এবং জামায়াত-শিবিরপন্থী শিক্ষকরা মিলে এইসব চক্রান্ত করেছে।’

অর্থের হিসাব প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে আগের সভপতি অধ্যাপক নাসির উদ্দিন তার সময়ের হিসাব দেননি। এজন্য আমিও এখন হিসাব দিতে পারছি না। আগের সভাপতি প্ল্যানিং কমিটিতে অনুমোদন ছাড়াই অর্থ উত্তোলন করে খরচ করেছে। আমি সভাপতি থাকা অবস্থায় এটার তদন্ত করবো এই ভয়ে দেননি।’

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেন অধ্যাপক নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এসব মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এসব বলেছেন। আমার সময়ের সকল হিসাব প্রদান করা হয়েছে এবং সেগুলো বর্তমান সভাপতির কাছে সংরক্ষিত আছে।’

উর্দু বিভাগের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মাদ শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব ছাড়ার দিন তাকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। এরপর বিভাগের একাডেমিক সিদ্ধান্তে তাকে একাধিবার চিঠি পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। এক পর্যায়ে আমরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানাই। প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, এখনো পর্যন্ত কোনো রিপোর্ট আসেনি।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বিগত প্রশসানের সময়ে এমন একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে শুনেছি। তিনি বর্তমানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের দায়িত্বে আছেন। তো এমন সম্মানিত একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আমরা সেটি খতিয়ে দেখবো। ওই বিভাগে যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেটার সত্যতা যাচাই করা হবে। আমি যতটুকু শুনেছিলাম সেখানে বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের একটা ব্যাপার ছিল।

Read more — শিক্ষা
Home