
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও সহিংসতার ধরন ক্রমেই বদলাচ্ছে। শারীরিক হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে অনলাইন হয়রানি, যৌন হুমকি, সাইবার স্টকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিকৃত ছবি ছড়িয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা। অথচ এসব অপরাধের বিচারে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হুমকির নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত প্রতিকার এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা অবসান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে গত ২ নভেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানায় সংগঠনটি। এতে বলা হয়, সাংবাদিকদের সুরক্ষাকে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের দৃশ্যমান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্যও সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে তাঁর পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ। এসব হুমকি উপেক্ষা করা হলে শুধু ওই সাংবাদিকই ঝুঁকিতে পড়েন না, তাঁর সহকর্মীদের মধ্যেও ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি হয়। এতে শেষ পর্যন্ত জনগণের তথ্য জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউনেস্কোর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বিএনএনআরসি জানায়, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ৮৬ শতাংশ ঘটনায় বিচার হয়নি। ২০১২ সালে এ পরিসংখ্যান চালু হওয়ার পর এই প্রথম বিচারহীনতার হার বেড়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, দুই বছরে বিশ্বে ১৮৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জনই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের স্তব্ধ করতে শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, অপহরণ, নির্যাতন, অন্যায় আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানিমূলক মামলার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। ছয়টি যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় ৫০ জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরে সংগঠনটি। অপরাধের ধরন আধুনিক হলেও জবাবদিহি ও বিচারের ব্যবস্থা সেই গতিতে এগোচ্ছে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারহীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনএনআরসি। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের এক দশকের বেশি সময় পার হলেও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। একইভাবে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা শহরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের অনেক ঘটনারও বিচার হয়নি। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে নারী সাংবাদিকদের অনলাইন নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হয়। ইউনেস্কো ও আইসিএফজের 'দ্য চিলিং' প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া নারী সাংবাদিকদের ৭৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশেও বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, সাইবার হয়রানি এবং ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের পেশাগতভাবে নীরব করার চেষ্টা হচ্ছে। এসব ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি জানায়, প্রযুক্তিভিত্তিক জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) মোকাবিলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারে বিএনএনআরসি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটি নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের প্রযুক্তিভিত্তিক জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা জোরদারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে যৌন হুমকি, সাইবার স্টকিং, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং এআই দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি ব্যবহার করে হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি হুমকির প্রমাণ সংরক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনএনআরসি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ছয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হামলা ও গুরুতর হুমকির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধে জড়িত নির্দেশদাতা ও অর্থায়নকারীদের বিচারের আওতায় আনা; জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত সাড়াদান ব্যবস্থা ও হেল্পলাইন চালু; সাংবাদিকতার কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা পর্যালোচনা ও প্রত্যাহার; নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা ও এআই দিয়ে তৈরি বিকৃত কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা; গণমাধ্যমকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও বিচারহীনতা রোধে জাতিসংঘের কর্মপরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো। ২০১২ সালে গৃহীত এ পরিকল্পনার আওতায় বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা শুধু গণমাধ্যমের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একজন সাংবাদিক সহায়তা চাওয়ার পর রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তদন্ত এগোচ্ছে কি না এবং অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে কি না—এসবের মধ্য দিয়েই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। প্রতিটি জেলায় কার্যকর সুরক্ষা ও দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই বিচারহীনতা বন্ধের অন্যতম পথ।

