
কখনো ‘কাল আসেন’, কখনো ‘তথ্য সংগ্রহ চলছে’ এভাবে দিনের পর দিন অপেক্ষার পরও তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ। একই সঙ্গে ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি এবং বিভাগীয় দায়িত্বে অবহেলা, সাংবাদিকদের তথ্য না দেওয়াসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যেই গত রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য সাবেক রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদের বিদায় হয়েছে। বিদায়ের পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, ভোগান্তি ও নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। কেউ তাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘দীর্ঘসূত্রিতার মহান জনক’, কেউ বলেছেন ‘হয়রানি করার মহা ওস্তাদ’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান তার ফেসবুক পোস্টে ইফতিখারুল আলম মাসউদকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘মাসুদরা কোনকালেই ভালো হয় না এটা একটা পপুলার ডায়ালগ। দীর্ঘসূত্রিতার মহান জনক, হয়রানি করার মহা ওস্তাদ আর মিথ্যা কথা বলারও মহাওস্তাদ। মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার, অপমান-অপদস্থ করার মহান কারিগর।’
তিনি আরও লেখেন, ‘অনেকেই কী পরিমাণে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, তা সৃষ্টিকর্তা ও ভুক্তভোগী ভালো জানেন। কোনো কোনো সময়ে প্রধান প্রশাসকের আদেশ বা নির্দেশও তার নিকট পাত্তা পায়নি। তবে প্রধান প্রশাসকও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।’
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার নিয়ে জটিলতা হওয়ায় অনুমোদিত পদ সংখ্যার কাগজ নিয়ে রেজিস্ট্রারের কাছে যায়। তিনি বলেন, কাল আসেন, কাল গেলে পরশু আসেন। এভাবে প্রায় দুই মাস ১০ দিন পর অর্গানোগ্রাম দেন। পরে সার্কুলারে পাঁচটি পদের জায়গায় আটটি হয়ে যাওয়ায় সংশোধনের জন্যও বারবার গেছি, কিন্তু দেননি। সেখানেও প্রায় দুই মাস ১৪ দিন সময় নিয়েছেন। পুরো সময়ে আমার বিভাগের কলিগরা আমাকে ভুল বুঝেছেন। প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট ও হয়রানির মধ্যে থাকতে হয়েছে। এজন্যই আমি তাকে দীর্ঘসূত্রিতার মহান জনক বলেছি। এরকম হয়রানি শুধু আমি হইনি, অনেকেই হয়েছেন এখন জানতে পারছি।’
অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমানের পোস্টের মন্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ফজলুল হক তুহিন লিখেছেন, ‘নিকটতম প্রতিবেশী ও তিন দশকের অধিক কালের সুসম্পর্কের পরও আমার পদোন্নতি নিয়ে যে পরিমাণ নোংরামি, ষড়যন্ত্র, অপমান ও শয়তানি করেছে, সেটা একমাত্র আল্লাহ ও আমি জানি। দুনিয়াতে না হলেও আখেরাতে একদিন বিচার হবেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা অন্ধকার রাহুগ্রাস সরে গেল।’
তার ওই পোস্ট শেয়ার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদুর রহমান লিখেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একজন ব্যক্তি রেজিস্ট্রার পদ থেকে সরে যাওয়ার পরে তার প্রতি শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদেরকে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করতে আমরা কোনোদিন দেখিনি। রেজিস্ট্রারের চেয়ারে বসে থাকা এই লোকটাকে মানুষ কতটা ঘৃণা করত, তা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল-কলেজের শিক্ষকদেরকেও সে ছাড় দেয়নি, ইচ্ছেমতো হয়রানি করেছে! তার প্রতি এক সমুদ্র ঘৃণা প্রকাশ করছি।’
এ বিষয়ে অধ্যাপক কাজী জাহিদুর রহমান বলেন, ‘রেজিস্ট্রার হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা। তার কাজ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সেবা দেওয়া। কিন্তু অধ্যাপক মাসউদের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ফ্যাসিস্টসুলভ। নতুন শিক্ষকদের যোগদানে বিলম্ব, পছন্দের না হলে ফাইল ও আবেদন দীর্ঘদিন আটকে রাখা, মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতেন।’
সাংবাদিকদের তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ
সংবাদ সংগ্রহের জন্য অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদের কাছে তথ্য নিতে গিলে তথ্য না দেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংবাদের জন্য কোনো তথ্য প্যয়োজন হলে রেজিস্ট্রার দপ্তর বরাবর একাধিকবার আবেদন করলেও কোনো দেননি তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (রাবিসাস) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা ইরফান তামিম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য যা একেবারে প্রাইমারি লেভেলের, ওইসব তথ্যও উনি প্রদান করে না। উনি তথ্য ‘দিবেন না’ একথাও বলেন না, বরং বিভিন্ন দপ্তর থেকে নিয়ে, আগামীকাল, পরশু আসেন এগুলোর প্রক্রিয়া দেখিয়ে শেষমেশ তথ্য প্রদান করেন না। তিনি এভাবে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রটোকলে ফেলেন। রাবির জন্য এই রেজিস্ট্রার ছিল একটা কলঙ্ক, সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্যের ব্যাপারে মুঠোফোনে কল দিয়েও সাংবাদিকরা তাঁর সাড়া পেত না, হোয়্যাটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সিন করে রিপ্লাই দিতেন না। এমনকি আমি স্বয়ং অনেক সময় অফিসে গিয়ে তাকে ঠিকমতো পেতাম না। মাসখানেক আগেও ‘দেশের বাহিরে কতজন শিক্ষক পড়াশোনা করতে গিয়ে ফিরে আসেন নি’ শুধু এই তথ্যের জন্য উনি বিভিন্ন দপ্তরের কাজ এবং প্রসিডিওর দেখিয়ে মাস খানেক ঘুরিয়ে আর তথ্য দেয়নি আমাকে।’
বিভাগীয় কাজেও অভিযোগ
রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরবি বিভাগের অধ্যাপনা করছেন ইফতিখারুল আলম মাসউদ। বিভাগীয় কাজেও তার বিরুদ্ধে ক্লাস-পরীক্ষা না নেওয়া, পরীক্ষার খাতা আটকে রেখে সময়মতো ফলাফল প্রদানে বিলম্ব করতেন। ফলে কয়েকটি ব্যাচ সেশনজটে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরবি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা তার জন্য ভুক্তভোগী। তার জন্য বিভাগের অনেক ব্যাচ পিছিয়ে আছে। বিভাগে সেশনজট তৈরি হয়েছে। বিভাগ থেকে তাকে অফিসিয়ালি চিঠি দিয়েও জানানো হয়েছিল এই বিষয়ে। তবুও তিনি কিছু করেননি।’
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, ‘যারা এসব অভিযোগ করছেন, তাদের প্রমাণ দিতে বলুন। আমি দেখলাম তারাই এসব মিথ্যাচার করছে, যাদের আমি কোনো অবৈধ সুবিধা দিইনি, যারা অবৈধ সুবিধা নিতে পারেনি, তাদেরই একটি অংশ নানাভাবে এসব লিখছে। অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তারা দেবে।’

