উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫ অপরাহ্ণ
প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, প্রাণবৈচিত্র্য ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিতের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই নিরাপদ ও প্রকৃতিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

আজ সোমবার সকাল ১০টায় নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র যুব ফোরাম ও সবুজ জোটের যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে কৃষক-কৃষাণি, পরিবেশকর্মী, গবেষক, যুব প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সবুজ জোটের পবা উপজেলা সভাপতি রহিমা বেগমের সভাপতিত্বে এবং বরেন্দ্র যুব ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তারা বলেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর নামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকামাকড় নয়, মানুষ, মৌমাছি, মাছ, পাখি, মাটি, পানি এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলেন, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ক্যান্সার, হরমোনজনিত জটিলতা, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে।

বক্তারা জানান, ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশসহ চারটি এশীয় দেশে ব্যবহৃত ৯৬ ধরনের কীটনাশকের মধ্যে ৫৩টিকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কীটনাশকের কারণে খাদ্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে, মৌমাছিসহ পরাগায়নকারী প্রাণী এবং জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নওহাটা মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সামা বলেন, কৃষিজমি থেকে বিষাক্ত পানি খাল-বিলে গিয়ে মাছের পোনা নষ্ট করছে। এতে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমছে এবং অনেক জেলেকে পেশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি উপেন রবিদাস বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বুনো শাক, ভেষজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, শামুক ও কাঁকড়াসহ নানা প্রাকৃতিক খাদ্য বিলুপ্তির পথে। এতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্য বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বারসিকের গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী শহিদুল ইসলাম বলেন, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের সঙ্গে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এসব কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব বালাই নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিনির্ভর কৃষি চর্চা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সবুজ জোটের পবা উপজেলা সাধারণ সম্পাদক কৃষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিকল্প প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তার অভাবে কৃষকরা অনেক সময় রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন আরও সম্প্রসারণ সম্ভব।

প্রকৃতিনির্ভর কৃষি শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালনাকারী কৃষাণি সুলতানা খাতুন বলেন, স্থানীয় বীজ, জৈব সার ও জৈব বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি সম্ভব এবং মাঠপর্যায়ে এর সফলতাও ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

মানববন্ধন থেকে ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশে ব্যবহৃত সব কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার, প্রকৃতিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষকদের বিকল্প প্রযুক্তিতে ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ, মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী প্রাণী সংরক্ষণ, জাতীয় বিষক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ।

বক্তারা বলেন, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধের দাবি শুধু পরিবেশবাদীদের নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় দাবি। বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home