
পৌরসভার বয়স পঁচিশ বছর। এই সময়ে একটি শহরের প্রশাসনিক কাঠামো শুধু দাঁড়িয়ে যাওয়ারই কথা নয়, নাগরিক সেবায় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কথা। কিন্তু রাজশাহীর পুঠিয়া পৌরসভার বাস্তবতা ঠিক উল্টো। এক যুগ নয়, দুই যুগও নয়—প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পরও পৌরসভার নিজস্ব ভবন নেই। ভাড়া করা একটি ছোট্ট ভবনে গাদাগাদি করে চলছে সব ধরনের দাপ্তরিক কার্যক্রম। আর এই দীর্ঘ অব্যবস্থাপনার পেছনে এখন উঠে এসেছে সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগ।
যে অর্থে পৌর ভবন হওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থের বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগে দুই সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছে বর্তমান পৌর প্রশাসন।
জানা যায়, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পুঠিয়া পৌরসভা। কিন্তু সীমানা-সংক্রান্ত মামলার কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়নি। প্রায় দেড় যুগ প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হয় পৌরসভা। পরে আইনি জটিলতা কাটিয়ে ২০১৬ সালে প্রথম এবং ২০২০ সালে দ্বিতীয়বার জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিলেও পৌর ভবনের কাজ আর শুরু হয়নি। সময় পেরিয়েছে, জনপ্রতিনিধি বদলেছেন, প্রশাসন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি পৌরসভার ঠিকানা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাড়া করা ভবনের সীমিত জায়গায় চলছে পৌরসভার সব শাখার কার্যক্রম। পর্যাপ্ত কক্ষ নেই, নথি সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নেই, সেবা নিতে আসা মানুষের বসারও পর্যাপ্ত স্থান নেই। জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং কর, নাগরিক সনদ—সব ধরনের সেবা দিতে গিয়ে প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে ভোগান্তি।
পৌরসভার এক কর্মকর্তা বলেন, নিজস্ব ভবন না থাকায় অনেক কাজই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয় না। জায়গার সংকটের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রহিদুল ইসলাম বলেন, একটি পৌরসভা ২৫ বছরেও নিজের ভবন করতে না পারা অত্যন্ত লজ্জাজনক। সরকারি অর্থ নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা না হলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, আইনে সরকারি খাস জমি বা পৌরসভার নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। পুঠিয়া সদরে সরকারি জমিও রয়েছে। সময়মতো উদ্যোগ নিলে বহু আগেই একটি আধুনিক পৌর ভবন নির্মাণ সম্ভব ছিল। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং জবাবদিহির সংকট সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ নিতে দেয়নি।
বর্তমানে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাশ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, 'আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হলেও পৌরসভা এখনো বিপুল ঋণের বোঝা বহন করছে। অর্থসংকটের কারণে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।'
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আদর্শ পৌর ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় আয়তনের জমি পৌর সদরের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুঠিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের জায়গায় ভবন নির্মাণের একটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।'
এদিকে, পৌর প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থ জনতা ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু অডিটে দেখা যায়, ওই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের পর দুই সাবেক মেয়র প্রত্যেকে ২৯ লাখ টাকা করে মোট ৫৮ লাখ টাকা তহবিলে ফেরত দেননি। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ দুদকে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমান পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাস সুমিত বলেন, অডিট ও হিসাব পর্যালোচনায় অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়েছে। তাই প্রয়োজনীয় নথিপত্র দুদকে পাঠানো হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে।
দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অভিযোগটি প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক মেয়র আল মামুন খান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন, তাই কোনো মন্তব্য করতে চান না। অপর সাবেক মেয়র রবিউল ইসলাম রবির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

