উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

বিশ্ব ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সচেতনতা, স্ক্রিনিং ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

রাজশাহীতে গোলটেবিল বৈঠক
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ১১ জুন ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ব ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সচেতনতা, স্ক্রিনিং ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
বিশ্ব ফ্যাটি লিভার-২০২৬ উপলক্ষে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা-উত্তরা প্রতিদিন

ফ্যাটি লিভার এখন শুধু একটি চিকিৎসাবিষয়ক সমস্যা নয়, বরং দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে দেশে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো রোগ শনাক্ত ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনলে আগামী দিনে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের রোগী আরও বাড়বে।

বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের আয়োজনে ও বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের খ্যাতনামা লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। এবারের প্রতিপাদ্য— 'Act Now—এখনই পদক্ষেপ নিন'। নিরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার সচেতনতাই প্রতিরোধের হাতিয়ার স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে মিডিয়া পার্টনার ছিল উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় দৈনিক উত্তরা প্রতিদিন। গোলটেবিল বৈঠকে খ্যাতনামা লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞদের আলোচনা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

ফ্যাটি লিভার দ্রুত শনাক্তে সচেতনতা ও স্ক্রিনিং জরুরি

ডা. মো. রফিকুল ইসলাম 

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (লিভার বিভাগ) 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যা যকৃতে বা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে দেখা দেয়। একটি সুস্থ লিভারে সামান্য পরিমাণ চর্বি থাকে, তবে চর্বির পরিমাণ লিভারের মোট ওজনের ৫ শতাংশের বেশি হলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

ফ্যাটি লিভার বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফাইব্রোসিস এমনকি ক্যানসারের মতো জটিল রোগের কারণ হতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে সহজে ক্লান্তি অনুভব করা, শারীরিক দুর্বলতা, পেটের ডান উপরের অংশে অস্বস্তি বা ব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিভার বড় হয়ে যাওয়া। রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে পেটে পানি জমা, রক্তবমি, কালো পায়খানা, জন্ডিস ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

এছাড়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ,স্থূলতা, রক্তে চর্বির আধিক্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বংশগত কারণ ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের হার সবচেয়ে বেশি। তাই ফ্যাটি লিভারকে এখন মেটাবলিক সিনড্রোমের ‘হেপাটিক ম্যানিফেস্টেশন’ বা লিভারজনিত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতি বছরের জুন মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার ডে’র এবারের প্রতিপাদ্য “Act Now, Screen Today”। এর মূল লক্ষ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ করা।

‘জীবনযাত্রা না বদলালে বাড়বে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসার’

অধ্যাপক ডা: মোহা. হারুন অর রশীদ 

সাবেক বিভাগীয় প্রধান (লিভার বিভাগ)

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ফ্যাটি লিভার বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম দ্রুত বিস্তার লাভ করা অসংক্রামক রোগে পরিণত হয়েছে। একসময় এটি কেবল শহুরে ও সচ্ছল মানুষের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন গ্রামাঞ্চলেও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে এ রোগের বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ফ্যাটি লিভার কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। বর্তমানে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসজনিত রোগীর তুলনায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী অন্য কারণে পরীক্ষা করাতে গিয়ে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ার পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

একসময় চিকিৎসক সমাজের মধ্যেও ফ্যাটি লিভার নিয়ে সচেতনতা কম ছিল। অনেকেই এটিকে গুরুত্বহীন সমস্যা মনে করতেন। কিন্তু গবেষণা ও চিকিৎসা অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে, অবহেলা করলে এ রোগ প্রাণঘাতী জটিলতার কারণ হতে পারে।

আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমে গেছে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিকাজে যান্ত্রিকীকরণ, মোটরসাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং হাঁটাচলার অভ্যাস কমে যাওয়ায় মানুষ ক্রমেই স্থবির জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাত, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নারীদের ঘরের কাজ করাকে ব্যায়ামের বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই। সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট নিয়মিত হাঁটতে হবে। একই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা করলে চলবে না। এখনই সচেতনতা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গড়ে তুলতে পারলে দেশে ফ্যাটি লিভারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিটি চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ফ্যাটি লিভারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

‘ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি’

ডা. মো. শফিকুল ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ) 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার রোগ দ্রুত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এটি লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে। বর্তমানে অনেক রোগীর ভাইরাল মার্কার নেগেটিভ থাকলেও ফ্যাটি লিভারের কারণে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আগে ফ্যাটি লিভারকে গুরুত্বহীন সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

দেশে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব প্রায় ৩৩ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে সচেতনতা কর্মসূচি চালু, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্তি এবং স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ফ্যাটি লিভার বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এছাড়া, পুষ্টিনীতি বাস্তবায়ন, শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরি করাও সময়ের দাবি। বর্তমানে ফাইব্রোস্ক্যান পরীক্ষার উচ্চ খরচের কারণে অনেক রোগী পরীক্ষা করাতে পারেন না। তাই প্রতিটি মেডিকেল কলেজে ফাইব্রোস্ক্যান মেশিন স্থাপন করে স্বল্পমূল্যে পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে কম মূল্যে স্ক্রিনিং সুবিধা, চিকিৎসক সংগঠনের সেমিনার-ওয়েবিনার, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিএমআই ও ব্লাড সুগার পরীক্ষা এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আবার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

 

আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা জেলা-উপজেলায় সম্প্রসারণ জরুরি

ডা. মো. আব্দুল মুমিত সরকার 

সহকারী অধ্যাপক (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ) 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ফ্যাটি লিভার রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে অনেক রোগী দীর্ঘদিন বিষয়টি বুঝতে পারেন না এবং একসময় লিভার সিরোসিসের মতো জটিলতা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া, মেটাবলিক সিনড্রোম, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় রক্ত পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক থাকলেও লিভারে চর্বি জমে থাকতে পারে, ফলে রোগ নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে।

দেশে ফ্যাটি লিভার শনাক্তে সবচেয়ে সহজলভ্য ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো আল্ট্রাসোনোগ্রাম। এই পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের চর্বিকে গ্রেড-১, গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এ সেবা সহজলভ্য হওয়ায় কম খরচে রোগ নির্ণয় সম্ভব হচ্ছে।

আবার, আধুনিক পরীক্ষা ফাইব্রোস্ক্যানের মাধ্যমে শুধু লিভারের চর্বিই নয়, লিভারের স্থায়ী ক্ষতি বা ফাইব্রোসিস এবং সিরোসিসের মাত্রাও নির্ণয় করা যায়। তবে এ সেবা এখনও মূলত বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে এমআরআই, এমআর ইলাস্টোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান এবং লিভার বায়োপসিও ব্যবহার করা হয়। লিভার বায়োপসিকে এখনো ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটি ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষায়িত পদ্ধতি হওয়ায় সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না।

এদিকে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং আধুনিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে ফ্যাটি লিভারজনিত জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

শিশু-কিশোরদের লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি বাঁচাতে সচেতনতা জরুরি

ডা. আব্দুল্লাহ আল মুকিত 

সহকারী অধ্যাপক (হেপাটোলজি বিভাগ)

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে স্থূলতার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ফ্যাটি লিভার ও লিভার সিরোসিসের বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। শিশু বয়সে শুরু হওয়া স্থূলতা দীর্ঘমেয়াদে লিভারের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গড়ে তোলা জরুরি।

নব্বইয়ের দশকে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ছিল প্রধান উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী এবং ১৮ বছরের নিচে প্রায় ৮ শতাংশ শিশু ও কিশোর স্থূলতায় আক্রান্ত।

ফ্যাটি লিভার থেকে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি বা সিরোসিস হতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। ফলে শিশু বয়সে যাদের ফ্যাটি লিভার শুরু হচ্ছে, তাদের অনেকেই ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

শহরাঞ্চলে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার প্রবণতা বেশি। খেলার মাঠের সংকট, মোবাইল-কম্পিউটার ও টেলিভিশনে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং ফাস্টফুড ও চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের সহজলভ্যতা এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

যেসব শিশুর ওজন বেশি বা যাদের ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে, তাদের নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফাস্টফুড ও কার্বোনেটেড পানীয় গ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে হবে।

এছাড়া, অনেকের ওজন বেশি না থাকলেও তারা ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন এবং তাদের লিভার ক্ষতির ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাই শুধু স্থূল ব্যক্তিদের নয়, ঝুঁকিপূর্ণ সবাইকে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

জাতীয় নীতিমালা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে

ডা. মো. হাবিবুল হক (হাবিব)

সহকারী অধ্যাপক (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ) 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তরুণ বয়সেই লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় এ হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সিলেটে পরিচালিত একটি গবেষণায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া গেছে। স্থূল শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্তের হার ২৩ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

এদিকে, ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের অল্প বয়সে ফ্যাটি লিভার হয়েছে তাদের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার দেখা দিতে পারে। ফলে ১০ বা ১১ বছর বয়সে আক্রান্ত একটি শিশু ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সেই মারাত্মক লিভার রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

শিশুদের স্থূলতার পেছনে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খেলার মাঠের সংকট, অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস, ফাস্টফুড এবং চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্ক্রিন টাইম কমানো দরকার। 

এছাড়া, জাতীয় পুষ্টিনীতি বাস্তবায়ন, স্কুলের পাঠ্যক্রমে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাই, শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।

সরকার, চিকিৎসক, মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ডা. মো. তানভীর রহমান 

কনসালটেন্ট (হেপাটলজি বিভাগ)

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ফ্যাটি লিভার এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সারা বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। রোগটি কেবল লিভারে চর্বি জমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এ রোগ প্রতিরোধে সরকার, চিকিৎসক সমাজ, গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। 

ফ্যাটি লিভারকে এখনই একটি জনগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পোলিও বা যক্ষ্মার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধেও তেমন উদ্যোগ প্রয়োজন।

রোগীরা সাধারণত চিকিৎসকের কাছেই প্রথম পরামর্শ নিতে আসেন। তাই চিকিৎসকদের দায়িত্ব শুধু রোগ নির্ণয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরও ফ্যাটি লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। অবহেলা করলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে রোগটি লিভার সিরোসিসের মতো জটিল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

এছাড়া, জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়াকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

এদিকে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, খেলার মাঠের সংকট এবং অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি গ্রহণের বিকল্প নেই। বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসের প্রতিপাদ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আগামীকালের জন্য অপেক্ষা না করে ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ ও শনাক্তকরণে আজই পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত, নারীদের ঝুঁকি বেশি

ডা. ডিএম শাহিনুজ্জামান 

কনসালটেন্ট (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ)

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার রোগ নীরবে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণা অনুযায়ী দেশের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। আক্রান্তদের একটি অংশের ক্ষেত্রে রোগটি ধীরে ধীরে লিভার ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারে রূপ নিচ্ছে। সচেতনতার অভাব এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এটি দেশের জন্য বড় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বেশি। এ রোগ হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। তবে হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের মতো ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ দ্রুত প্রকাশ পায় না। লিভার সিরোসিসে পৌঁছাতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। ফলে অধিকাংশ মানুষ রোগটিকে গুরুত্ব দেন না এবং জটিলতা দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপনই একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা। কিন্তু এ চিকিৎসার ব্যয় অত্যন্ত বেশি, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাই রোগ প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কিছু গবেষণায় প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী নারী বলে দেখা গেছে। প্রোটিনের পরিবর্তে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটনির্ভর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, ফাস্টফুড গ্রহণ বৃদ্ধি এবং স্থবির জীবনযাপন এর অন্যতম কারণ।

তাই, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়া জরুরি।

ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ভূমিকা ও সম্ভাব্য উদ্যোগ

নাবিলা চৌধুরী

ডেপুটি মার্কেটিং ম্যানেজার, বায়োটেক (পিএমডি) 

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি

ফ্যাটি লিভার বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আধুনিক জীবনযাত্রা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের কারণে এ রোগের প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো- অধিকাংশ রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। ফলে সময়মতো শনাক্ত না হলে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ফলে ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ রোগের সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদ্রোগ এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় আধুনিক গবেষণা এখন এমন চিকিৎসা উদ্ভাবনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা একই সঙ্গে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ কমানোর পাশাপাশি রোগীর সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমোদিত নতুন ওষুধ, যেমন Resmetirom এবং Semaglutide, ফ্যাটি লিভার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে এসব আধুনিক চিকিৎসা সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের রোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। প্রথমত, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহযোগিতায় একটি জাতীয় MASLD/MASH ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন প্রণয়নে সহায়তা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফ্যাটি লিভার স্ক্রিনিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং FibroScan ও অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সুবিধার প্রাপ্যতা বাড়াতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

এছাড়া চিকিৎসকদের জন্য নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক গাইডলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং গবেষণা সহায়তা প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রোগীদের জন্য Patient Support Program (PSP) চালুর মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, ফলো-আপ, জীবনধারা পরিবর্তন এবং চিকিৎসা অনুসরণে সহায়তা করা যেতে পারে।

ফ্যাটি লিভার বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকার, চিকিৎসক সমাজ, গণমাধ্যম এবং ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য “Act Now—এখনই পদক্ষেপ নিন” আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপই পারে ফ্যাটি লিভারের ক্রমবর্ধমান বোঝা কমিয়ে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। 

 

Read more — স্বাস্থ্য
Home