উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

‘দাঁড়ায়া থাকতে থাকতে পায় ব্যতা ধইরা যায়’

উত্তরা ডেস্ক ১ মে ২০২৬, ০৯:২৯ অপরাহ্ণ
‘দাঁড়ায়া থাকতে থাকতে পায় ব্যতা ধইরা যায়’

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও আজ রাজধানীতে নিত্যদিনের মতো চলাচল করছে গণপরিবহনগুলো। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় সড়কে তেমন যানজট না থাকলেও প্রতিদিনের মতো বাসগুলো থেকে যাত্রীদের জন্য চলছে সেই চেনা ডাক-হাঁক। তেজগাঁওয়ের সড়কে মন্থরগতিতে চলা ‘ভিআইপি’ বাস থেকে কিশোর কণ্ঠে মিরাজ (ছদ্মনাম) ডাকছিল...‘এই ঢাকা কলেজ...নীলক্ষেত...আজিমপুর...ওই ওস্তাদ বেরেক—যাত্রী আছে।’

মিরাজ বাসচালকের সহকারী, হেলপার! বয়স ১৪-১৫ হবে। বাসে সিট না পেয়ে ভেতরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। কালক্ষেপণ, সেই সঙ্গে কৌতূহলী মনে শ্রমিক দিবস নিয়ে প্রশ্ন করতে ঝরঝরে কণ্ঠে উত্তরে মিরাজ বলল, ‘আইজকা ছুটি তাই না মামা?’ এটুকুতে যা বুঝলাম তাতে অন্তত মিরাজের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা বাড়ানোটা আদিখ্যেতা মনে হলো!

মিরাজের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলাম। সে জানাল, প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রী ওঠানো-নামানো, ভাড়া তোলা, যাত্রী ডাকাডাকি সবই করে সে। আর এই পুরো সময়টা টানা দাঁড়িয়ে করতে হয়।

তার ভাষায়—‘সকাল থেইকা রাত পর্যন্ত কাম করি, দাঁড়ায়া থাকতে থাকতে পায় ব্যতা ধইরা যায়। দিন শ্যাষে পাই ৫০০।’

দেশে শিশুশ্রমের বিষয়ে শাস্তিযোগ্য বিধান থাকলেও সেগুলোর বালাই চোখে পড়ে না। রাজধানীর যেকোনো এলাকার সড়কে চারপাশে একবার চোখ ঘুরালে কোথাও না কোথাও শিশু শ্রমিক চোখে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু তার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও অন্যায় হয় বলে অভিযোগ করল মিরাজ। জানাল, একই পরিবহনের বাসে কাজ করা বড়দের তুলনায় সে কম মজুরি পায়। এর কারণ হলো, সে বয়সে ছোট। প্রাপ্তবয়স্করা যেখানে দৈনিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন, সেখানে সে আটকা নির্ধারিত ৫০০ টাকাতেই।

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে মিরাজ জানাল, ১২ বছর বয়সে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসে। দূরসম্পর্কের মামার মাধ্যমে এই কাজে যুক্ত হয়। পরিবারের অভাব-অনটনই তাকে অল্প বয়সে জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছে।

মিরাজ বলে, ‘গেরামে থাকলে খাওন জুটত না ঠিকমতো। তখন ঢাকায় আইসা এই কাজ ধরি। এখন নিজে চলি, বাড়িতেও কিছু দিই।’

দীর্ঘ সময় কাজ, বিশ্রামের অভাব, স্বল্প আয়—এসবের মধ্যেও নিজের জীবন নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ নেই তার। বলল, ‘আমি খুশিই আছি। কাম করি, খাই। দুঃখ কইরা কী হইব?’

এতক্ষণ অগোচরে বাসচালকও আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন। একপর্যায়ে তিনি আওয়াজ দিয়ে বললেন, ‘আমরা কী করমু মামা বলেন, অরাও নেয়, আমরাও নেই—এইভাবেই তো চলে।’

মিরাজের অভিযোগ ও বাস্তবতার দায় মেনে নিলেন তিনিও। বললেন, ‘ছোটদের কম দেয়, এইটা ঠিক। কিন্তু এই দায় শুধু আমাদের দিলে হবে না মামা, বাসের মালিক-নেতা দায় তো সবারই তাই না?’

প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতেই নেমে পড়তে হলো গন্তব্যে। তবে আজকের দিনেও ছুটি পায়নি শিশু শ্রমিক মিরাজ!

 

Read more — সারাদেশ
Home