উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

পরীক্ষার হলে তক-বিতর্ক, বিসিএস পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রের ছবি তুলে রাখলেন পিএসসির এক সদস্য

উত্তরা ডেস্ক ১ মে ২০২৬, ০৯:০২ অপরাহ্ণ
পরীক্ষার হলে তক-বিতর্ক, বিসিএস পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রের ছবি তুলে রাখলেন পিএসসির এক সদস্য

৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় তক-বিতর্কের জেরে এক পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্র ও ওএমআর শিটের ছবি তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) এক সদস্যের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, অপর এক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার কক্ষে নিষিদ্ধ অলঙ্কার খুলে ফেলার জন্য বলছিলেন ওই পিএসসি সদস্য। এ সময় উচ্চশব্দে ‘বকাঝকা’ করায় ভুক্তভোগীর লিখতে অসুবিধা হওয়ায় আস্তে কথা বলার ‘অনুরোধ’ থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত।

গত ২০ এপ্রিল আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫০৫ নম্বর কক্ষে এই ঘটনা ঘটে। এদিন ৫০তম বিসিএসের আন্তর্জাতিক বিষয়ের লিখিত পরীক্ষা চলছিল। ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী শরীফ উদ্দিন রাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র। আর পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. শরীফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষক। তিনি বর্তমানে ডেপুটেশনে রয়েছেন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে শরীফ উদ্দিন রাজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করি, একজন পরিদর্শক আমার পাশের বেঞ্চে বসা এক নারী পরীক্ষার্থীর সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। ওই পরীক্ষার্থী ভুলবশত একটি ছোট নোজ পিন পরে এসেছিলেন, সেই বিষয়টি নিয়ে তাকে ৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে বকাঝকা করা হচ্ছিল। উচ্চস্বরে কথাবার্তার কারণে আমার লেখায় ব্যাঘাত ঘটছিল। তাই আমি স্যারকে উদ্দেশ্য করে বলি, স্যার, আস্তে কথা বলবেন, লিখতে সমস্যা হচ্ছে।’

 

শরীফ উদ্দিন রাজ বলেন, ‘তখন তিনি উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলেন, কী বললে? আমি পুনরায় বলি, আপনার কথা বলার কারণে আমার লিখতে অসুবিধা হচ্ছে। এরপর তিনি আমাকে বলেন, তোমার খাতা দাও। আমি জিজ্ঞেস করি, আমি খাতা দেব কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি? তখন তিনি বলেন, তোমার তো ম্যানার্স ঠিক নেই। আমি বলি, স্যার, আপনার কথা বলার কারণে আমার সমস্যা হচ্ছে— এটা কি আমি বলতে পারি না?’

‘এরপর তিনি আমার সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে থাকেন। তখন আমি কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে বলি, আপনি আমার সঙ্গে এমন স্বৈরাচারী আচরণ করছেন কেন? আপনার কথাবার্তার কারণে এখানে সবারই সমস্যা হচ্ছে। যদি ওই পরীক্ষার্থীর বড় কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আপনি তাকে আলাদা কোথাও নিয়ে কথা বলতে পারেন’— যোগ করেন ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী।

বলেন, ‘এরপর তিনি ওই পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে সরে এসে আমার কাছে আসেন। প্রথমে আমার বাম পাশে ছিলেন, পরে ঘুরে ডান পাশে আসেন। তিনি আমার কলমের ব্যাগ তল্লাশি করেন এবং সেখানে কোনো নিষিদ্ধ বস্তু আছে কী—না দেখেন। কিছু না পেয়ে আবার বলেন, তোমার খাতা দাও। আমি পুনরায় জানতে চাই, আমার অপরাধ কী? কিন্তু তিনি কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেই আমার খাতা নিতে চান। আমি তখন বলি, আমার যদি কোনো অপরাধ থাকে, তাহলে আপনি আমাকে বহিষ্কার করতে পারেন, সমস্যা নাই। তবে দয়া করে অপরাধ উল্লেখ করে তা করবেন। এখন সময় খুব কম, আমার অনেক লেখা বাকি আছে।’

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এরপর স্যার আমার কাছ থেকে মূল খাতা নিয়ে রুমের একদম সামনে চলে যান। সেখানে কিছুক্ষণ ধরে খাতা উল্টেপাল্টে দেখেন। এরপর আমাকে বলেন, তুমি ৫ মিনিট পর খাতা পাবে। যাওয়ার আগে তিনি রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে বলে যান, ৫ মিনিট পর ওকে খাতা দিয়ে দেবেন। এরপর তিনি রুম থেকে চলে যান। তখন আমি আর কিছু বলিনি। কিছুক্ষণ পর তিনি আবার রুমে ফিরে আসেন এবং আমার কাছে এসে অ্যাডমিট কার্ড চান। আমি অ্যাডমিট কার্ড দিলে তিনি সেটি এবং আমার মূল খাতার উপরের ওএমআর মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলে নেন। এরপর তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে আমাকে খাতা ফেরত দিতে বলে চলে যান। ছবি ওএমআর শিটের ছবি তোলার বিষয়টি সামনে বসা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জানতে পারি।’

এদিকে শরীফ উদ্দিন রাজ এ ঘটনায় ফেসবুকে পোস্ট দিলে সেখানে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক শরীফ হোসেনের বিভাগের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে বেশ কয়েকজন তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ উত্থাপন করেন। তবে ওই পরীক্ষার্থীরও সমালোচনা করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, পরিদর্শক পরীক্ষার হলে অন্য কারো সঙ্গে কথা বলার সময় তৃতীয় পক্ষ হয়ে তার কথা বলা উচিত হয়নি। এ ছাড়া তিনি যেভাবে পিএসসি সদস্যকে আস্তে কথা বলতে বলেছিলেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. শরীফ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, তিনি পরীক্ষার খাতা নিয়েছিলেন, তবে আটকে রাখেননি। এ ছাড়া তিনি কেবল প্রবেশপত্রের ছবি তুলেছিলেন। ওএমআর শিটের ছবি তোলার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন।

অধ্যাপক শরীফ হোসেন ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘ওর পাশের একটা মেয়ে স্বর্ণের নাকফুল পরে এসেছিল। আমি তাকে বললাম যে স্বর্ণের জিনিসপত্র আনা নিষেধ। এগুলো খুলে ফেল। এইটুকু বলেছি, আর ও পাশ থেকে খুব চিৎকার করে উঠছে। ওর সাথে আমার কোনো ইন্টারেকশনই হয়নি, কিছুই হয়নি। হয়তো প্রথমে বুঝতে পারেনি যে আমি পিএসসি মেম্বার। খুবই বাজে বিহেভিয়ার শুরু করেছে। আমি এরকম ছাত্র আমার জীবনে প্রথম দেখলাম। আমাকে বারবার বলছে, আপনি বাইরে গিয়ে কাজ করেন।’

তিনি বলেন, ‘এমনকি বারবার আমাকে বলছিল, স্যার আপনি আমাকে এক্সপেল করেন। খুবই বাজে এটিচিউড করছিল, খুবই অ্যারোগ্যান্ট অ্যাটিচিউড শো করছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল ছেলেটা মানসিকভাবে অসুস্থ। এটা ভুলও হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষার কাজে অনেক সময় রিস্কও থাকে আমাদের, অনেকে হুমকি দেয়, ক্ষতি করে। এজন্য আমি তার প্রবেশপত্রের একটা ছবি নিয়েছিলাম। কারণ এরকম কোনো সমস্যা হলে তাকে তো শনাক্ত করতে হবে।’

এ বিষয়ে ঘটনার দিন প্রত্যক্ষদর্শী পরীক্ষকের পরিচয় জানা সম্ভব না হওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ একজন অধ্যাপক গণমাধ্যমকে বলেন, পিএসসি সদস্য অধ্যাপক শরীফ হোসেনের বিরুদ্ধে তার বিভাগেও এরকম অভিযোগ শোনা গিয়েছিল। তিনি পরীক্ষার হলের পাশাপাশি ভাইভা বোর্ডেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কঠোরতা করেন। এ ছাড়া যে কোনো কারণেই হোক, পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্র বা ওএমআর শিটের ছবি তুলে রাখা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না।

 

Read more — শিক্ষা
Home