উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

‘ক্ষমতাধর’ ক্যাডারে পিছিয়ে নারীরা

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিতে এগিয়ে; প্রশাসন-পুলিশে পিছিয়ে
বিশেষ বিসিএসে নারীদের সাফল্য প্রায় ৫০ শতাংশ
উত্তরা ডেস্ক ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ণ
‘ক্ষমতাধর’ ক্যাডারে পিছিয়ে নারীরা

সিভিল সার্ভিস বা বিসিএসে কিছু ক্যাডারকে চিহ্নিত করা হয় ক্ষমতাধর হিসেবে। যার মধ্যে প্রশাসন, পুলিশ আর পররাষ্ট্র অন্যতম। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার থেকেই বেশি সচিবসহ শীর্ষ পদগুলোতে পদায়ন হয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে 'গুরুত্বপূর্ণ' এসব ক্যাডার কর্মকর্তার অবাধ বিচরণ— যাদের বেশিরভাগই পুরুষ। প্রভাবশালী ক্যাডারগুলোতে নারীর যে অনুপাত, তা উল্লেখ করার মতো নয়। অথচ সবশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি।

বিসিএসের ক্যাডারগুলোয় নারী-পুরুষের অনুপাত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারগুলোয় পুরুষের তুলনায় ভালো করছেন নারীরা। এমনকি বিশেষ বিসিএসেও এগিয়ে নারীরা। কিন্তু ‘ক্ষমতাধর’ ক্যাডারগুলোয় নারীরা রয়েছেন অনেকটা পিছিয়ে।

দেশে নারী শিক্ষার হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসে ৯০-এর দশকে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে মেয়েরা। আর উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। ২০১৩ সালে ৩৮ শতাংশে থাকা নারীরা ২০২৪ সালে ৫০ শতাংশের ঘর পার করেছেন।

তবে শিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে চাকরির বাজারে, বিশেষ করে বিসিএসে এর প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি নারীরা। সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সর্বশেষ ছয়টি বিসিএসের ফলাফলে উঠে এসেছে, নারীরা পেশাগত ও কারিগরি বিসিএসে ভালো করলেও সাধারণ ক্যাডারে নেই পুরুষের ধারেকাছেও।

বিভিন্ন বিসিএসে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক তিন ধাপে প্রার্থী বাছাইয়ের পর চাকরির জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করে পিএসসি। সবশেষ ছয়টি বিসিএসের মধ্যে ৩৯তম, ৪২তম এবং ৪৯তম ছিল বিশেষ। এই বিসিএসে শুধু প্রিলি এবং ভাইভা দিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পান প্রার্থীরা। দেখা গেছে, এসব বিসিএসে ভালো করেছেন নারীরা। তবে তিন ধাপের সাধারণ বিসিএসগুলোয় পিছিয়ে পড়েছেন তারা।

‘ক্ষমতাধর’ ক্যাডারে এগিয়ে পুরুষ

পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ৪৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য বরাদ্দ ১৫৯টি পদের বিপরীতে নারীরা পেয়েছেন মাত্র ৯টি। পুলিশে ৬৪ জনের মধ্যে চার এবং পররাষ্ট্রে ১৩ জনের মধ্যে তিনজন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ ছাড়া আনসারে এক, নিরীক্ষা ও হিসাবে পাঁচ এবং কর ক্যাডারে সুপারিশ করা হয়েছে তিনজন নারীর নাম।

এই বিসিএসে সুপারিশ পাওয়া ৯৩৪ জনের মধ্যে নারী ২৪৯ জন। সাধারণ ক্যাডারের ৪৪৯টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৮৫টি। অর্থাৎ নারী প্রার্থীদের সুপারিশপ্রাপ্তির হার প্রায় ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

গত বছরের ৮ নভেম্বর ৪৪তম বিসিএসের এই চূড়ান্ত সুপারিশ দিয়েছিল পিএসসি। একই বছর কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ৮৮৫টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ১৬৪টি; যা ক্যাডারের ৩৩ দশমিক ৮১ শতাংশ।

অন্যদিকে বিশেষায়িত বিসিএস যেমন— স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারে সাফল্য দেখিয়েছেন নারীরা। বিশেষ কিছু ক্যাডারে নারীদের এই পিছিয়ে পড়াকে শুধু মেধার বিষয় নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজনীন ইসলাম। তার মতে, এটি সুযোগ ও পরিবেশগত কারণেও হয়ে থাকে।

তিনি বলছিলেন, ‘অনেক নারীর মেধা থাকার পরও পরিবারের পরামর্শে নিরাপদ বা আরামদায়ক ক্যাডার যেমন শিক্ষা বা স্বাস্থ্যকে পছন্দক্রমে আগে রাখেন। প্রশাসন বা পুলিশে কাজ করার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক সুবিধার অভাব অনেক প্রার্থীকে এসব ক্যাডারে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করে।’

আবার ২০১৮ সালে বিসিএসে ১০ শতাংশ নারী কোটা বাতিলের প্রভাবও পড়েছে সার্বিক নারী ক্যাডারে। কোটা থাকায় অনেক নারী সরাসরি মেধার লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ‘ক্ষমতাধর’ হিসেবে পরিচিত ক্যাডারগুলোয় সুযোগ পেয়ে যেতেন। কিন্তু কোটা বাতিল হয়ে যাওয়ায় সে সুযোগটিও সীমিত হয়ে গেছে।

অন্য ক্যাডারগুলোয় যে নারীরা ভালো করছেন, তার উদাহরণ ৩৯তম বিসিএস। বিশেষ ওই বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭৯২ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে নারীরা সুযোগ পান ৪৭ শতাংশের বেশি। একইভাবে ৪২তম বিশেষ বিসিএসেও নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। সেবার ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ নারী সুপারিশ পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে ৪০তম, ৪১তম ও ৪৪তম সাধারণ বিসিএসে নারীরা ক্যাডার পেয়েছে মাত্র ২৬-২৭ শতাংশ। সবচেয়ে কম ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ ক্যাডার পেয়েছে ৪৩তম বিসিএসে। কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ৪৮৫টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ১৬৪টি।

দেখা গেছে, কৃষিতে সবচেয়ে ভালো করছেন নারীরা। কৃষি ক্যাডারে বা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার জন্য ৮৫টি পদে বিপরীতে ৪৩টি পেয়েছেন তারা। একইভাবে শিক্ষা ক্যাডারের ইংরেজি, অর্থনীতি, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়গুলোতেও নারীরা তুলনামূলক ভালো করেছেন।

বিভাগভিত্তিক সাফল্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ঢাকা বিভাগের নারীরা, পিছিয়ে সিলেট। ৪৪তম বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে ঢাকা বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি ৬২ জন, কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ১৯ নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ঢাকার পর চট্টগ্রাম থেকে ১৩, খুলনা থেকে ১১ এবং রাজশাহী থেকে ছয়জন নারী সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও রংপুর থেকে পাঁচ, বরিশাল থেকে দুই এবং সিলেট থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন সর্বনিম্ন একজন নারী।

 

Read more — জাতীয়
Home