উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

পরীক্ষা চলাকালে কলেজে বিএনপি নেতাকর্মীদের তাণ্ডব, অধ্যক্ষসহ আহত ৫

নারী শিক্ষককে জুতা দিয়ে পেটানোর অভিযোগ
উত্তরা প্রতিবেদক ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ণ
পরীক্ষা চলাকালে কলেজে বিএনপি নেতাকর্মীদের তাণ্ডব, অধ্যক্ষসহ আহত ৫

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালে ১৪৪ ধারা ভেঙে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় এক নারী শিক্ষককে প্রকাশ্যে জুতা দিয়ে পেটানোর ঘটনাও ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে এসব ঘটনায় অধ্যক্ষসহ অন্তত পাঁচজন শিক্ষক-কর্মচারী আহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ওই কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়ায় কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল এবং সকাল থেকেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল। এসময় স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের কক্ষে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। বিশেষ করে আগের অধ্যক্ষের সময়ে কলেজের আয়-ব্যায়ের হিসাব চান তারা। এ নিয়ে তাদের মধ্য কথা কাটাকাটি হয়। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় তারা প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এর জেরে ওই নারী শিক্ষক বিএনপি নেতা আকবর আলীকে থাপ্পড় মারেন। এতে তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিএনপি নেতা আকবর ওই নারী শিক্ষককে জুতা দিয়ে পেটাতে থাকেন। পরে চুলের মুঠি ধরেও মারধর করেন। কিছুক্ষণ পর বিএনপির অন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা চালান তিনি। এ সময় অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুরও করা হয়।

হামলায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ আরও দুই কর্মচারী। তাদের কয়েকজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ঘটনার সময় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরীক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরাকে জুতা দিয়ে পিটিয়ে আহত করেছেন। তাকে রক্ষা করতে গেলে অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকেরাও হামলার শিকার হন।

ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষার্থী, দায়িত্বরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় কলেজ ত্যাগ করেন।

আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করে বলেন, আকবর আলী, আফাজ আলী, শাহাদ আলী, জয়নাল আলী, এজদার আলী, রুস্তম আলী ও জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলায় অংশ নেন। তাদের দাবি, পূর্ব থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। কিন্তু এতে রাজি না হওয়ায় এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়।

অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চার মাস আগে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। তিনি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।

প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতেন। আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসতো। অধ্যক্ষ নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। বিধায় কোনো পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না। এটাই অপরাধ ছিলো অধ্যক্ষের। আর একজন শিক্ষক বা সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষকের পাশে থাকাটাই আমার অপরাধ। আমি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও কেন অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়েছি এটাও আমার একটা অপরাধ। এই অপরাধে আমাকে প্রকাশ্যে জুতা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, যা একজন শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য চরম অপমানজনক।

তবে বিএনপি নেতা আকবর আলী বলেন, এই কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কলেজের জমি, গাছপালা বিক্রি সহ বিভিন্নক্ষাতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন মোজাম্মেল হক। সেই সময়ের হিসাবের ফিরিস্তি বারবার চাইলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের দেননি। উল্টো আমাদেরকে ভয় ভীতি দেখান। এমনকি ঘটনার দিনে কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে আমাদের উপরে হামলা করে এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে চড়-থাপ্পড় মারেন। যার ফলশ্রুতিতে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেছে এবং অফিস কক্ষ অফিস ভাঙচুর করেছে।

দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল এবং উভয় পক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করা হয়। তবে কিছু লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home