উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী বাগমারার হাজারদুয়ারি প্রাসাদ

আমজাদ হোসেন শিমুল ১৪ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
 বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী বাগমারার হাজারদুয়ারি প্রাসাদ
বাগমারার হাজারদুয়ারি এই প্রাসাদটি এখন শুধুই স্মৃতি -উত্তরা প্রতিদিন

বাংলাদেশেও একসময় ছিল হাজার দরজার এক বিশাল রাজপ্রাসাদ। জমিদারি ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও ইতিহাসের এক অনন্য স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রাসাদ আজ অনেকটাই বিস্মৃত। কালের বিবর্তনে পরিত্যক্ত হলেও রাজশাহীর এক গ্রামে এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপনাটি বয়ে বেড়াচ্ছে হারিয়ে যাওয়া জমিদার আমলের অসংখ্য গল্প।

রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার যুগিপাড়া ইউনিয়নর বীরকুতসা গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়িটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘হাজার দরজার প্রাসাদ’ নামে। একসময় এটি ছিল আত্রাই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের আবাসস্থল এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র।

ভারতের মুর্শিদাবাদে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাজার দুয়ারি প্রাসাদ সম্পর্কে অনেকেই জানেন। সেই বিখ্যাত প্রাসাদে রয়েছে এক হাজার দরজা। সেই স্থাপত্যশৈলী থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বাগমারার এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন আত্রাই অঞ্চলের জমিদার রাজা গোপাল ধামের জামাতা বিরেশ্বর ব্যানার্জি।

স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাবিয়া হক বলেন, “ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা গোপাল ধামের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তার একমাত্র কন্যা ছিলেন প্রভাতী বালা। জমিদারি কাজের প্রয়োজনে তিনি প্রায়ই দিল্লি যাতায়াত করতেন। একবার তীর্থভ্রমণে গিয়ে বারাণসীতে অসুস্থ হয়ে পড়লে বিরেশ্বর ব্যানার্জি নামে এক স্থানীয় যুবক তার সেবা করেন। তার সততা ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে রাজা তাকে আত্রাইয়ে নিয়ে আসেন এবং পরে নিজের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দেন।”

বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে একটি নতুন পরগনা সৃষ্টি করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় বিরেশ্বরপুর। সেই পরগনায় একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণের জন্য দেওয়া হয় বিপুল অর্থ। সেই অর্থেই গড়ে ওঠে বীরকুতসা গ্রামের এই রাজকীয় স্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দা শ্রী উত্তম কুমার প্রামাণিক জানান, “জমিদার আমলে এই জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে কেউ জুতা পরে কিংবা মাথায় ছাতা দিয়ে যেতে পারত না। জমিদারদের প্রতি সম্মান দেখাতে মানুষ দূর থেকে জুতা খুলে হেঁটে যেত।”

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এই প্রাসাদটি ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী। মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারি প্রাসাদ দেখে অনুপ্রাণিত হলেও বিরেশ্বর ব্যানার্জির স্ত্রী প্রভাতী বালার একটি শর্ত ছিল—দুটি প্রাসাদ যেন একেবারে একই রকম না হয়। ফলে নির্মিত হয় এক অভিনব স্থাপত্য—হাজার দরজার প্রাসাদ, কিন্তু এতে ছিল না একটি জানালাও।

প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই রাজপ্রাসাদের মূল ভবন ছিল প্রায় দুই একর জমির ওপর নির্মিত দোতলা বিশাল স্থাপনা। মূল ভবনের দুই পাশে ছিল আরও দুটি আলাদা ভবন, যেখানে বসবাস করতেন বিরেশ্বর ব্যানার্জির দুই ভাই।

প্রাসাদের ভেতরে ছিল তিনটি আলাদা উঠান। এছাড়া জমিদারি পরিচালনার জন্য ছিল প্রশাসনিক দপ্তর, বিচার কক্ষ, খাজনা আদায়ের ঘর এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য মোহাফেজখানা। অতিথিদের থাকার জন্য ছিল আলাদা কক্ষ এবং একটি বিশাল নাচঘর। সেই নাচঘরে সে সময়ের খ্যাতিমান শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করতেন।

স্থানীয়দের মুখে মুখে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা শোনা যায়। এমনই এক অনুষ্ঠানের সময় রাজার তৃতীয় সন্তানকে পালিত একটি হাতি গিলে খেয়ে ফেলেছিল। পরে কয়েক ঘণ্টা পর হাতি সেই বাচ্চাটি বমি করে দিলেও বাচ্চাটিকে আর বাঁচানো যায়নি। 

প্রাসাদের কাছেই ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় অবিনাশ হাই স্কুল, যা বর্তমানে পরিচিত বীরকুতসা অবিনাশ স্কুল ও কলেজ নামে। জমিদার পরিবারের উদ্যোগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে সময়ের পালাবদলে এই জমিদার পরিবারের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ভারত বিভাগের ঘটনার পর জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে প্রাসাদটি সরকারের অধীনে চলে আসে। একসময় এটি ছাত্রাবাস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি। বর্তমানে প্রাসাদের অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে এবং অবশিষ্ট অংশও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দর্শনার্থী আতিক মাহমুদ বলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কিন্তু যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করায় ধীরে ধীরে এটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংস্কার করা হলে এটি একটি বড় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। যুগিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম.এম. মাজিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, “এটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক সম্পদ। সরকার যদি এটি সংস্কার করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে, তাহলে এলাকার অর্থনীতি ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক এ.কে.এম সাইফুর রহমান বলেন, “প্রাসাদটি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। ভবিষ্যতে এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।”

আজ পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ যেন বিরেশ্বর ব্যানার্জি ও প্রভাতী বালার স্বপ্নের রাজপ্রাসাদের নীরব সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণ ও উদ্যোগ নেওয়া হলে বিস্মৃত ইতিহাসের এই স্থাপনাটি নতুন করে পরিচিতি পেতে পারে এবং হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র।

 

ইএফ/

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home